
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : রাজধানী ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ৯ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ‘এয়ার অ্যাস্ট্রা ঢাকা ট্রাভেল মার্ট ২০২৬’। ২১তম বারের মতো আয়োজিত এই মেলায় স্বাগতিক বাংলাদেশসহ নেপাল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য দেশের মোট ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। মেলায় ৮০টিরও বেশি বুথে ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেটর, বিমান সংস্থা, হোটেল-রিসোর্ট, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নানা আকর্ষণীয় প্যাকেজ, মূল্যছাড় এবং বিনিয়োগের সুযোগ প্রদর্শন করে।
আয়োজক সংস্থা দেশের ভ্রমণ ও পর্যটনবিষয়ক প্রকাশনা ‘দ্য বাংলাদেশ মনিটর’ জানিয়েছে, তিন দিনব্যাপী এই মেলায় সব মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার ব্যবসা সম্পন্ন হয়েছে। মেলার শেষ দিন শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিটি বুথে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। কর্মকর্তারা ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন গ্রাহকদের সেবা দিতে। মেলায় প্রবেশমূল্য ছিল মাত্র ৫০ টাকা, যা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য সহজলভ্য করেছে। এছাড়া র্যাফেল ড্রয়ের মাধ্যমে বিমান টিকিট, হোটেল স্টে এবং অন্যান্য আকর্ষণীয় পুরস্কার জেতার সুযোগও ছিল।
মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি ভ্রমণকারীদের পাশাপাশি দেশীয় পর্যটকদের জন্য বিশেষ অফার নিয়ে এসেছিল। কক্সবাজারের সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা ‘পে ফর ওয়ান অ্যান্ড থ্রি নাইটস’ অফার দিয়েছে। এতে এক রাতের মূল্যে তিন রাত থাকার সুযোগ মিলেছে, সঙ্গে এক দিনের ওয়াটার পার্ক ও রাইড ফ্রি। রুমভেদে প্যাকেজের দাম ছিল ২০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে, কক্সবাজারের লং বিচ হোটেল রুম ভাড়ায় সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ ছাড় দিয়েছে। ছাড়ের পর দুজনের জন্য রুমভেদে ভাড়া নেমে এসেছে ৪ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ৮ হাজার ১০০ টাকায়।
লং বিচ হোটেলের বিক্রয় ও বিপণন প্রধান মো. ইমরান হুমায়ন খান জানান, এবার মেলায় বুকিং কিছুটা কম হয়েছে। গত বছর তিন দিনে প্রায় ২০০টি প্যাকেজ বুকিং হয়েছিল, এবার প্রথম দুই দিনে ৭০টির মতো এবং শেষ দিনে কিছু বুকিং মিলিয়ে মোট প্রায় একশ’র কাছাকাছি হয়েছে। তবে প্রচারের দিক থেকে মেলা সফল বলে মনে করছেন তিনি।
বিমান সংস্থাগুলোও ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এয়ার অ্যাস্ট্রা তিন দিন দুই রাতের প্যাকেজ অফার করেছে কক্সবাজারের ওসেন প্যারাডাইস বিচ হোটেল, সায়মন বিচ রিসোর্ট, সিগাল হোটেলসহ মোট ৮টি হোটেলে। বিমান টিকিটসহ জনপ্রতি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১৬ হাজার ৬৫০ টাকা। অন্যদিকে, ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ১৫ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ১২ শতাংশ ছাড় দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “মেলায় আশানুরূপ সাড়া পেয়েছি। মূল লক্ষ্য ছিল প্রচার। দর্শনার্থীদের আগ্রহ দেখে বিদেশে নতুন রুটে ফ্লাইট চালানোর পরিকল্পনায় সহায়তা পাওয়া গেছে।”
পর্যটন খাতে বিনিয়োগের সুযোগও ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করা ছুটি গ্রুপ মেলায় তাদের চারটি চালু রিসোর্টের পাশাপাশি কক্সবাজার, কুয়াকাটা ও পূর্বাচলে নির্মাণাধীন পাঁচটি রিসোর্টে বিনিয়োগের অফার দিয়েছে। বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ থেকে ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত, মেলা উপলক্ষে ১৫ শতাংশ ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। গোল্ড স্যান্ডস গ্রুপ তাদের হোটেল, রিসোর্ট, ভবন ও জমিসহ ৮টি প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরেছে। এখানে বিনিয়োগের সীমা ৬ লাখ থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক সাইফুল আলম জানান, মেলায় মোট ৭৫টি ইউনিটে বিনিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বাংলা নববর্ষের বিশেষ ছাড়ও ঘোষণা করা হয়েছে।
এই মেলা শুধু ব্যবসায়িক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। দেশীয় পর্যটনের সম্ভাবনা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন রুটের সম্ভাবনা অন্বেষণে মেলা সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই মেলাকে আরও বড় পরিসরে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে যাতে আরও বেশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারে।
সার্বিকভাবে, ‘ঢাকা ট্রাভেল মার্ট ২০২৬’ বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের পুনরুজ্জীবনে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত পর্যটকদের জন্য সাশ্রয়ী অফার, বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—সব মিলিয়ে এই মেলা দেশের পর্যটন খাতকে নতুন গতি দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজন আরও বেশি সংখ্যক দর্শনার্থী ও ব্যবসায়ীকে আকৃষ্ট করবে বলে আশা করা যায়।



