
পর্যটন সংবাদ প্রতিবেদক: সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক রত্ন টাঙ্গুয়ার হাওড় যেন একদিকে পর্যটকদের আনন্দ-বিনোদনের কেন্দ্র, আর অন্যদিকে প্রকৃতির ওপর ভয়াবহ এক হুমকি। সম্প্রতি ১ আগস্ট বারেক টিলার সামনে ঘাটে বিশাল আকৃতির হাউসবোটগুলো ভিড়লে শুরু হয় অস্বস্তিকর এক অভিজ্ঞতা। রাতের বেলায় শান্ত হাওড়জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে জেনারেটরের বিকট শব্দ, যা কানে সহ্য করা কঠিন বলে জানিয়েছেন অনেক পর্যটক।
শুধু জেনারেটরের শব্দই নয়, পর্যটকদের উচ্চ শব্দে গান বাজানো, সাউন্ডবক্সের ব্যবহার, পানিতে ময়লা-আবর্জনা ফেলাসহ নানা অনিয়ম পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। হাওড়ে থাকা পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য এটি হয়ে উঠেছে রীতিমতো আতঙ্কের নাম।
হুমকিতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন হাওড় এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটি (হাউস)-এর নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, “হাওড়ের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পথে। আইনের প্রয়োগ না থাকা ও ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে এমন অবস্থা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই হাওড়কে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিন বছরের জন্য পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ করে ‘লকডাউন’ দিলে মাছ ও পাখি ফিরে আসবে।”
হুমকি শুধু শব্দ নয়, দূষণেও বিপর্যস্ত হাওড়
হাউসবোটগুলো থেকে জেনারেটরের শব্দ ছাড়াও সাবান, শ্যাম্পু ও ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানি ফেলা হচ্ছে সরাসরি হাওড়ে। সঙ্গে রয়েছে চিপস-প্যাকেটসহ অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্য পানিতে নিক্ষেপের ঘটনা। ফলে হাওড়ের পানি দ্রুত দূষিত হচ্ছে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, টাঙ্গুয়ার হাওড়ের পানিতে নিকেল, ক্রোমিয়াম, সিসা, জিংক, তামা ও ম্যাঙ্গানিজসহ ছয় ধরনের ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি দূষণ মিলেছে বারেক টিলা সংলগ্ন পানিতে।
পর্যটনের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাণবৈচিত্র্য
আইইউসিএন-এর সর্বশেষ তথ্যমতে, এক সময় টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ১৩৪ প্রজাতির মাছ, ২১৯ প্রজাতির পাখি ও ১০৪ প্রজাতির উদ্ভিদ ছিল। তবে পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরে দেশি ও পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমেছে ৭৭ শতাংশ। মাঝিরা জানান, এখন আগের মতো মাছও পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রশাসনের উদ্যোগ কার্যকর নয়
পর্যটকদের সচেতন করতে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ১২ দফা নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে তার বাস্তবায়ন প্রায় অনুপস্থিত। বরং হাওড়ে এখন চলাচল করছে প্রায় ২০০০-এরও বেশি হাউসবোট, যেগুলোতে ৫০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত যাত্রী বহনের ব্যবস্থা রয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওড় শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি একটি জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ পরিবেশগত অঞ্চল। পর্যটনের নামে যদি এই ধ্বংস চলতেই থাকে, তবে অচিরেই হারিয়ে যাবে দেশের এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ।
পর্যটন হোক সচেতনতার, নয়তো হাওড় হারাবে প্রাণ – এই আহ্বানই এখন সময়ের দাবি।



