
ওসমান হাদি সমাহিত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন গুলিতে নিহত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি। শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয় তার জানাজা। সেখানে অংশ নেয় লাখ লাখ মানুষ। সময়, স্থান আর নিরাপত্তা—সব সীমা ছাড়িয়ে এই জানাজা পরিণত হয় এক অভূতপূর্ব গণসমাবেশে।
দুপুর ২টায় জানাজা শুরুর কথা থাকলেও সকাল থেকেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ঢল নামে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষজন ভোরের আলো ফোটার আগেই ঢাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কেউ বাসে, কেউ ট্রাকে, কেউবা মোটরসাইকেলে—যে যেভাবে পেরেছেন, হাজির হয়েছেন শেষ বিদায়ে শরিক হতে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এমন জনসমাগম খুব কমই দেখা গেছে।
ভিড় সামাল দিতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দক্ষিণ প্লাজায় সাধারণ মানুষের প্রবেশের অনুমতি দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রতিটি প্রবেশপথে বসানো হয় কড়াকড়ি নিরাপত্তা। চীন থেকে আনা আটটি আর্চওয়ে গেট দিয়ে পর্যায়ক্রমে মানুষ ভেতরে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কারও মধ্যে বিরক্তি ছিল না। মুখে ছিল শোক, চোখে ছিল ক্ষোভ আর গর্ব—এই তিনের অদ্ভুত মিশেল।
জানাজা শেষে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। জাতীয় কবির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। অনেকের কাছে এই স্থান নির্বাচন প্রতীকী। নজরুল যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন, হাদিও তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন—এমনটাই বলছিলেন জানাজায় অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ ও সহযোদ্ধারা।
শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু ঘিরে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও স্পষ্ট। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে তাকে মাথায় গুলি করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৮ ডিসেম্বর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
এই কয়েক দিনে হাদির শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে যেমন উদ্বেগ ছিল, মৃত্যুর পর তেমনি তৈরি হয় জনআবেগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ—সবখানেই তার নাম উচ্চারিত হয়েছে প্রতিবাদের ভাষায়। অনেকেই বলছেন, হাদির মৃত্যু শুধু একজন মুখপাত্রের মৃত্যু নয়; এটি একটি সময়ের, একটি আন্দোলনের ক্ষত।
জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষজনের কণ্ঠে একই কথা—এই হত্যার বিচার হতে হবে। তারা চান, দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হোক। নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে সাধারণ মানুষের যে উদ্বেগ, এই জানাজা সেই অনুভূতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
শেষ পর্যন্ত শরীফ ওসমান হাদি চলে গেলেন, রেখে গেলেন প্রশ্ন, দাবি আর স্মৃতি। নজরুলের পাশে তার চিরনিদ্রা যেন সেই প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করে তোলে। এই বিদায় শুধু শোকের নয়, এটি এক ধরনের নীরব শপথও—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শপথ।



