
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের হরিপুর জমিদার (চৌধুরী) বাড়ি একসময় এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু আজ সংরক্ষণের অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার পথে। জমিদারদের মৃত্যুর পর বাড়িতে এখন মাত্র কয়েকটি পরিবারের বসবাস। চারপাশে সবুজ গাছপালায় ঘেরা মনোমুগ্ধকর পরিবেশ, নানা শৈল্পিক নকশায় গড়া ভবনগুলো এখনও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে এটি শুধু ভ্রমণপিপাসুদের জন্য নয়, সিনেমা ও টেলিভিশনের শুটিংয়েরও অন্যতম আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যে এই বাড়ি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে, যা ঐতিহ্যপ্রেমীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে জমিদার বাড়ির বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, দর্শনার্থী, শিক্ষক এবং উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই স্থাপনার ইতিহাস শতাধিক বছরের পুরনো। জেলা শহরের পালবাজার ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় চান্দ্রা চৌরাস্তায় যাওয়া যায়। জনপ্রতি ভাড়া মাত্র ৫০ টাকা। চৌরাস্তা থেকে আরও একটি অটোরিকশায় করে জমিদার বাড়িতে পৌঁছাতে লাগে জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা। পুরো পথটি সবুজ ধানক্ষেত ও গ্রামীণ দৃশ্যে ভরা, যা দর্শনার্থীদের মনকে প্রথম থেকেই মুগ্ধ করে। বাড়িতে প্রবেশের জন্য রয়েছে একটি বড় গেট। ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে অসংখ্য পুকুর, পুকুরঘাট, মসজিদ, জমিদারদের কবরস্থান, এতিমখানা, ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং হরিপুর বাজার। চারদিকে ঘন গাছপালা, নিরিবিলি পরিবেশ যেন শহুরে কোলাহল থেকে অনেক দূরে একটি শান্ত আশ্রয়।
বাড়ির বাসিন্দা গোফরান চৌধুরী জানান, তাদের পূর্বপুরুষরা প্রায় শতবছর এখানে বসবাস করেছেন। তারা ছিলেন মূলত ব্যবসায়ী। বর্তমানে সাতটি পরিবার এখানে থাকেন এবং তারা চতুর্থ প্রজন্ম। তাদের বাবা-চাচারা অনেকে সরকারি বিভিন্ন পদে চাকরি করতেন। তিনি আরও বলেন, রূপসা জমিদার বাড়ির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল। তারা এলাকায় খাজনা তুলতেন কারণ তাদের বিশাল সম্পত্তি ছিল। বিশেষ করে মরহুম কামিজ রাজা, জমিদার মৌলভী মতিরাজা, উমেদ রাজা, মুহাম্মদ রাজাসহ মোট সাতজন জমিদার এখানে দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন। গোফরান চৌধুরীর কথায় ফুটে ওঠে পুরনো দিনের গৌরব। তিনি বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরা শুধু জমিদারি করেননি, এলাকার মানুষের উন্নয়নে অনেক কাজ করেছেন।”
আরেক বাসিন্দা মো. ইমরুল হুদা চৌধুরী জানান, তাদের অনেক আত্মীয়স্বজন এখন চাঁদপুর শহরের চৌধুরী পাড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম এমনকি যুক্তরাজ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। বছরে একবার তারা বাড়িতে আসেন প্রয়াতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করাতে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিল্ডিং ও স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। তিনি বলেন, “কয়েক বছর আগে গিয়াস উদ্দিন সেলিম পরিচালিত ‘পাপ পূণ্য’ সিনেমার শুটিং হয়েছে এখানে। যারাই আসেন ঘুরতে বা কাজে, আমরা সবসময় সহযোগিতা করি। এখন শুধু প্রয়োজন এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িটিকে রক্ষা করা।” তার কথায় স্পষ্ট হয়, সংরক্ষণ না হলে শতাব্দীর স্মৃতি একদিন মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।
চান্দ্রা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আমির হোসেন এই বাড়িরই বাসিন্দা। সে বলে, “জেনেছি আমার পূর্বপুরুষরা জমিদার ছিলেন। এটা জেনে খুব ভালো লাগে। অনেকে আমাদের বাড়ি দেখতে আসেন।” তার চোখে-মুখে গর্বের ছাপ স্পষ্ট। দর্শনার্থী এমরান হোসেন শহর থেকে এসেছিলেন। তিনি বলেন, “পুরো বাড়ি ঘুরে দেখেছি। পুরনো ভবনগুলোর নকশা অসাধারণ। বিশেষ করে পুকুরঘাট ও মসজিদের স্থাপত্য চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সংরক্ষণ না করলে সব হারিয়ে যাবে।” তার মতো অনেক দর্শনার্থীই মনে করেন, এই বাড়ি চাঁদপুরের পর্যটন সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
হরিপুর নেছারিয়া ডিগ্রি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নুর মোহাম্মদ খান জানান, জমিদার বংশের লোকজনের কারণে এলাকার বহু মানুষ উপকৃত হয়েছেন। অনেকেই ছিলেন ধার্মিক ও উচ্চশিক্ষিত। তিনি বলেন, “তাদের দানশীলতায় এখানে মাদ্রাসা, এতিমখানা গড়ে উঠেছে।” মাদ্রাসার আরেক শিক্ষক মিজানুর রহমান যোগ করেন, “শুধু মাদ্রাসা নয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন জমিদাররা। আজও তাদের বংশধররা সামাজিক কাজে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।” এসব কথায় ফুটে ওঠে যে জমিদার বাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি ছিল সমাজের উন্নয়নের এক বড় প্রেরণা।
চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস.এম.এন জামিউল হিকমা বলেন, “হরিপুর চৌধুরী বাড়ির লোকজন জমিদার ছিলেন এবং বাড়িটি খুবই সুন্দর। শুনেছি সিনেমার শুটিং হয়েছে। আমার এখনও যাওয়া হয়নি, তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।” তার এই ঘোষণায় স্থানীয়দের মধ্যে আশার আলো দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এই বাড়িকে জাদুঘর বা হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করলে চাঁদপুরের পর্যটন শিল্প নতুন মাত্রা পাবে। এখানে ঘুরতে এলে দর্শনার্থীরা শুধু স্থাপত্য দেখবেন না, ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ অনুভব করবেন।
এই জমিদার বাড়ির সৌন্দর্য যেন কথা বলে। পুরনো ভবনের দেওয়ালে খোদাই করা নকশা, পুকুরের স্বচ্ছ পানি, মসজিদের আজানের ধ্বনি—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব পরিবেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবনগুলোর অবস্থা খারাপ হচ্ছে। ছাদের টিন জং ধরছে, দেওয়ালে ফাটল ধরছে। বাসিন্দারা চান, সরকার যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। যদি সংরক্ষণ হয়, তাহলে এটি হতে পারে চাঁদপুরের একটি আইকনিক স্থান। পর্যটকরা আসবেন, সিনেমা নির্মাতারা শুটিং করবেন, স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ শুধু একটি ভবন রক্ষা করা নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা। হরিপুর জমিদার বাড়ি তার উজ্জ্বল উদাহরণ। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মও এই স্মৃতি দেখতে পাবে। এখন সময় এসেছে সবাই মিলে এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করার। চাঁদপুরের মানুষের প্রত্যাশা, এই বাড়ি যেন শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে সংরক্ষিত হয় এবং পর্যটনের নতুন দ্বার উন্মোচন করে।



