
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ঈদের লম্বা ছুটিতে সমুদ্রপ্রেমী পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে দক্ষিণ বাংলার উপকূলীয় অঞ্চল। কুয়াকাটার সোনালি বালুকাবেলায় যারা ভিড় জমান, তাদের অনেকেই জানেন না যে এই সমুদ্রকন্যার ঠিক পাশেই রয়েছে এক অপার্থিব নীরবতার আশ্রয়স্থল। নাম তার চর হেয়ার। বঙ্গোপসাগরের বিশাল নীল বুকে যেন সৃষ্টিকর্তার হাতে গড়া এক টুকরো স্বপ্নভূমি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় দিগন্তের শেষ প্রান্তে জেগে উঠেছে এক অজানা স্বর্গ। কাছে গেলে সেই অনুভূতি যেন আরও গভীর হয়ে ধরা দেয়। অসীম আকাশ আর অনন্ত সমুদ্রের মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট দ্বীপটি প্রকৃতির এক নিঃশব্দ কবিতা। সোনালি বালিয়াড়ি, ঢেউয়ের ছন্দময় আছড়ে পড়া, বাতাসের মৃদু স্পর্শ—সব মিলিয়ে এখানে যেন সময় থেমে যায়। ঈদের এই আনন্দময় ছুটিতে পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে চর হেয়ারে একদিন কাটালে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে, তা শহুরে জীবনের কোলাহল থেকে একেবারেই ভিন্ন। এখানে প্রকৃতি নিজেই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, কোনো কৃত্রিমতা নেই, শুধু বিশুদ্ধ নির্জনতা আর অপার সৌন্দর্য।
চর হেয়ারের ভৌগোলিক অবস্থানটিও বেশ আকর্ষণীয়। পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলার শেষ প্রান্তে অবস্থিত এই দ্বীপটি অনেকের কাছে ‘হেয়ার চর’ বা ‘কলা গাছিয়ার চর’ নামেও পরিচিত। দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রয়েছে বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ‘সোনার চর’, যেখানে হরিণসহ নানা বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ। পূর্ব দিকে চর আন্ডা, পশ্চিমে চর তুফানিয়া, উত্তরে টাইগার দ্বীপ ও চর কাশেম—এসব আশপাশের চরগুলোও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। কুয়াকাটা থেকে সাগরপথে এই চরের দূরত্ব মাত্র ৩৫.১৯ কিলোমিটার। আর রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার। এই স্বল্প দূরত্ব সত্ত্বেও চর হেয়ার যেন একেবারে আলাদা জগৎ। এখানে পৌঁছালে মনে হবে কোলাহলময় শহর থেকে হাজার মাইল দূরে চলে এসেছেন। সকালের প্রথম আলোয় যখন পাখিরা কলরবে ভোরের নীরবতা ভাঙে, তখন এই দ্বীপের সৌন্দর্য যেন নতুন করে জেগে ওঠে। বিস্তীর্ণ বালুচরে লাল কাঁকড়ার দল ছুটোছুটি করে যেন জীবনের চঞ্চল রেখা আঁকে। দূরে ভাসমান মাছধরা নৌকাগুলো আর আকাশজুড়ে সাদা মেঘের খেলা—সব মিলিয়ে চর হেয়ার সত্যিই এক স্বপ্নীল জগৎ।
ভ্রমণের আদর্শ সময় হিসেবে শীতকালকে অনেকেই বেছে নেন। তখন বঙ্গোপসাগর তুলনামূলক শান্ত থাকে এবং অতিথি পাখির ঝাঁক দেখা যায়। তবে ঈদের ছুটিতে গরমের মাঝেও এই দ্বীপের আকর্ষণ কমে না। বরং ঈদের আনন্দের সঙ্গে প্রকৃতির এই নীরবতা মিলে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। চর হেয়ারে রাত্রিযাপনের জন্য রয়েছে ছোট ছোট তাবু ও কটেজ। এক রাতের জন্য তাবু ভাড়া মাত্র ৪০০ টাকা। সমুদ্রের ঢেউয়ের কলকল শব্দ শুনতে শুনতে নির্জন রাতে তাবুতে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা যেন স্বপ্নের মতো। সৈকতের পাশে ছাতাসহ আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা রয়েছে পর্যটকদের জন্য। বনভূমির ভেতরে গাছের সঙ্গে বাঁধা দোলনা শিশু থেকে বয়স্ক সবাইকে আনন্দ দেয়। খাবারের ব্যবস্থাও চমৎকার। সাগরের তাজা মাছ, মুরগি, ভাতসহ বিভিন্ন প্যাকেজ পাওয়া যায়। থাকা-খাওয়া, ট্রলার সার্ভিস, তাবু-কটেজসহ পুরো ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা করে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘সোনার চর ট্যুরিজম অ্যান্ড ট্রাভেলস’। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও চর হেয়ার ট্যুরিস্ট নিরাপত্তা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে ০১৭১৯৩৬৮১৭৮ নম্বরে। তবে এখানে দোকান বা ফার্মেসি কম থাকায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও মোবাইল চার্জার সঙ্গে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
যাতায়াতের পথও বেশ সহজ ও আকর্ষণীয়। নৌপথে ঢাকার সদরঘাট থেকে সরাসরি লঞ্চে রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ লঞ্চঘাটে পৌঁছানো যায়। ডেকের ভাড়া ৬৫০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ১২০০ টাকা। সেখান থেকে ট্রলারে ১৫০০ টাকায় বা স্পিডবোটে ২০০০ টাকায় চর হেয়ারে যাওয়া সম্ভব। কয়েকজন মিলে ভাড়া ভাগাভাগি করলে খরচ কমে যায়। সড়কপথে ঢাকা থেকে পটুয়াখালী চৌরাস্তা পর্যন্ত বাসে ৬৫০ টাকা। সেখান থেকে মোটরসাইকেলে হরিদেবপুর ফেরিঘাট, তারপর ট্রলারে গলাচিপা। পানপট্টি লঞ্চঘাট থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে লঞ্চ ছাড়ে চরমোন্তাজের উদ্দেশ্যে। ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ টাকা। প্রায় তিন ঘণ্টার নদীযাত্রায় আগুনমুখা ও তেতুলিয়া নদীর মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। চরমোন্তাজ থেকে আধা ঘণ্টায় ট্রলারে বা ১৫ মিনিটে স্পিডবোটে চর হেয়ারে পৌঁছে যাওয়া যায়। বিকল্প হিসেবে কুয়াকাটা থেকে সরাসরি ট্রলার বা স্পিডবোটে ৩০০০-৩৫০০ টাকায় চলে আসা যায়। এই যাত্রাপথগুলো নিজেই এক অসাধারণ অ্যাডভেঞ্চার।
চর হেয়ারে পৌঁছে যা দেখবেন, তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। চার কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাময় সমুদ্র সৈকত, যেখানে নীল জলরাশি অবিরাম আছড়ে পড়ছে। দ্বীপের বুকে ঝাউ, পেয়ারা, ছইলা, কেওড়া, গেওয়া, বাইন, গোলপাতাসহ নানা গাছের ঘন বন। এই সবুজ বনভূমিতে হাজারো দেশি-বিদেশি অতিথি পাখির কলকাকলি। সারস, বক, শামুকখোল, মদনটাক, ডাহুক, কোড়াসহ অসংখ্য পাখি গাছের মগডালে আশ্রয় নেয়। দোলনায় শুয়ে দুলতে দুলতে তাদের গান শুনলে শহুরে ক্লান্তি এক নিমেষে উড়ে যায়। সৈকতে বসে সাগরের গর্জন শোনা যায়। সূর্যোদয়ের লাল আভা আর সূর্যাস্তের সোনালি-কমলা রঙে পুরো দ্বীপ যেন রঙিন হয়ে ওঠে। বালুচরে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য—সব মিলিয়ে প্রকৃতির এক অপূর্ব চিত্র। এছাড়া এটি চমৎকার পিকনিক স্পট। শিশুদের জন্য নানা বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে।
চর হেয়ার শুধু একটি দ্বীপ নয়, এটি এক অনুভূতি। এখানে এসে মনে হয় কোলাহল থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি, যেখানে প্রকৃতি নিজেই কথা বলে। ঈদের এই ছুটিতে যদি আপনি সত্যিকারের শান্তি ও সৌন্দর্য খুঁজে থাকেন, তাহলে কুয়াকাটার সঙ্গে চর হেয়ারকে অবশ্যই যোগ করুন। পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে এই নিভৃত দ্বীপে একটি দিন কাটালে জীবনের স্মৃতিতে যোগ হবে এক অমূল্য অধ্যায়। সোনালি বালু, নীল সমুদ্র আর সবুজ বনের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হবে—এই তো প্রকৃতির সবচেয়ে বড় উপহার। আইয়ুব খানের মতো স্থানীয় উদ্যোক্তারা যে নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করছেন, তাতে পর্যটকদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। শুধু প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করলেই এই স্বর্গদ্বীপ আপনাকে মুগ্ধ করে রাখবে। তাই ঈদের ছুটির পরিকল্পনায় চর হেয়ারকে অগ্রাধিকার দিন। দেখবেন, ফিরে আসার পরও মন পড়ে থাকবে এই নীরব দ্বীপের অপার্থিব সৌন্দর্যে। প্রকৃতির এই নিঃশব্দ ডাকে সাড়া দিয়ে আসুন, চর হেয়ারে। এখানে সময় যেন ধীরগতিতে বয়ে যায়, আর প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে অবিস্মরণীয়।



