আড়াইহাজারে বদলে যাওয়া সাতগ্রাম–দুপ্তারা–ব্রাহ্মন্দী: ভাঙা সড়ক থেকে ইউনিব্লকের নয়া পর্যটনপথ

আড়াইহাজারে বদলে যাওয়া সাতগ্রাম–দুপ্তারা–ব্রাহ্মন্দী: ভাঙা সড়ক থেকে ইউনিব্লকের নয়া পর্যটনপথ

ছবি : সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : আড়াইহাজার উপজেলার সাতগ্রাম, দুপ্তারা এবং ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের মানুষ বহু বছর ধরে যে দুর্ভোগকে নিত্যসঙ্গী ভেবে নিয়েছিলেন, সেটি ছিল ভাঙাচোরা গ্রামীণ সড়ক। বর্ষা এলেই রাস্তাগুলো কাদা, গর্ত আর জমে থাকা পানিতে অচল হয়ে যেত, যেখানে রিকশা চলা তো দূরের কথা, হাঁটাও যেত না আর শুকনো মৌসুমে ধুলোর ঝড়ে বাতাস ভারী হয়ে উঠত, ঘরবাড়ি ঢেকে যেত মিহি ধুলায়। স্থানীয়দের কাছে মাঠে ফসল নেওয়া, স্কুলে বা বাজারে যাওয়া, জরুরি কাজে বের হওয়া—সবই ছিল কষ্টের। এই তিন ইউনিয়নের মানুষ বছরের পর বছর এমন অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য হলেও অন্তরে ছিল একই হাহাকার—কখন বদলাবে এই ভাঙা পথ? সেই অপেক্ষার অবসান হলো এখন, যখন পুরো অঞ্চলের সড়ক ব্যবস্থায় এসেছে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রূপান্তর। প্রচলিত ইটসোলিং, খোয়া-বালুর রাস্তার পরিবর্তে এখানে প্রথমবারের মতো নির্মাণ করা হয়েছে রঙিন ইউনিব্লকের টেকসই ও দৃষ্টিনন্দন সড়ক, যা এলাকাবাসীর চোখে শুধু স্বস্তিই নয়, এক ধরনের অহংকারও এনে দিয়েছে। গত কয়েক মাসে পুরো এলাকা যেন নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে; গ্রামের শ্যামল পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে ইউনিব্লকের সড়কগুলো এখন পর্যটনপথের মতোই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয় তরুণেরা প্রতিদিন ছবি তোলে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় রঙিন সড়কের সৌন্দর্য; আর আশপাশের উপজেলা থেকেও মানুষ ভিড় করছেন শুধুমাত্র এই সড়কগুলো দেখতে। পুরনো দিনের ধুলোমাখা দুর্ভোগ ভুলে গ্রামের মানুষ এখন নতুন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বলেন—গ্রামেও এমন সৌন্দর্য থাকতে পারে!

আড়াইহাজারে পরিবর্তনের এই যাত্রা শুরু হয় এলজিইডির সিআরডিপি-২ প্রকল্পের মাধ্যমে, যার আওতায় সাতটি সড়কে মোট ২২ কিলোমিটার ইউনিব্লক বসানোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। সড়কগুলো হলো বড় বিনাইরচর–বালিয়াপাড়া জিসি রোড ৬ কিলোমিটার, বালিয়াপাড়া জিসি–ইদবারদী আরএইচডি রোড সাড়ে ৩ কিলোমিটার, মনোহরদী–লস্করদী বাজার রোড ১ কিলোমিটার, কালিবাড়ী বাজার–মনোহরদী রোড দেড় কিলোমিটার, তিলচন্দী–ফাউসাবাজার রোড সাড়ে ৩ কিলোমিটার, প্রভাকরদী আরএইচডি–ফরিদা বাজার রোড ২ কিলোমিটার এবং নোয়াদ্দা–চারিগাঁও সড়ক ৪ কিলোমিটার। ২০২৩ সালে সড়কগুলোর কাজ শুরু হলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর ঠিকাদারদের অনেকেই কাজ অসম্পূর্ণ রেখে চলে যান। রাস্তা খুঁড়ে রেখে যাওয়া, কাদা আর ভাঙা সেতুর কারণে পুরো এলাকা ক’মাস পরিণত হয়েছিল ‘দুর্ভোগের জনপদে’। কারও গাড়ি চলত না, বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারত না, কৃষিজ পণ্য নিয়ে বাজারে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। পরে পুরোনো ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে আবার নতুন করে শুরু হয় কাজ। তারপর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই অক্টোবরে সাতটির মধ্যে চারটি সড়কের কাজ একদম শেষ হয়, আর বাকি তিনটির কাজও আগামী জানুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কাজের অগ্রগতি দেখে এলাকার মানুষ মনে করছেন—এই প্রথম কোনো গ্রামীণ সড়ক প্রকল্পে তারা স্বচক্ষে দেখলেন সময়মতো কাজ শেষ হওয়ার আনন্দ।

ইউনিব্লক কেন এত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—এর ব্যাখ্যা এলজিইডির প্রকৌশলীরা দিয়েছেন স্পষ্টভাবে। সাধারণ পিচঢালা বা কার্পেটিং রাস্তা খুব দ্রুত ক্ষয় হয়, বিশেষ করে যেখানে রাস্তার পাশে খাল–পুকুর থাকে এবং বর্ষায় পানি ওঠানামা করে। ইউনিব্লক সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং সহজে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য। বালি, পাথরকুচি ও সিমেন্টের মিশ্রণে তৈরি এই কংক্রিট ব্লকগুলো শুধু মজবুতই নয়, পানি নামার পথও রাখে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সহজেই বদলে ফেলা যায়। নারায়ণগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান বলেন, সরকার ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে গ্রামীণ সড়কে কার্বন নিঃসরণ কমাতে চায়, আর ইউনিব্লক সেই উদ্যোগের বাস্তব উদাহরণ। টেকসই অবকাঠামোর ধারণা এখন শুধু শহরে নয়, গ্রামেও পৌঁছাতে শুরু করেছে—আড়াইহাজার তার জীবন্ত প্রমাণ।

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া এই পরিবর্তনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক। নোয়াদ্দা–চারিগাঁও সড়কে দেখা যায় কামাল হোসেন, ইকবাল মিয়া, বাবুল মিয়া আর তোরাব আলীর মতো বাসিন্দারা হাঁটছেন হাসিমুখে, বলছেন—“এই অজপাড়াগাঁয়ে এমন রাস্তা হবে, ভাবতেই ভালো লাগে।” আশপাশের অনেক মানুষ কেবল রাস্তা দেখতে এসে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে দিচ্ছেন। মাধবদী থেকে এসে শাহীন খন্দকার বলেন, “গ্রামের মধ্যে এত সুন্দর আর পরিপাটি রাস্তা থাকবে—এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।” পাঁচ দশক ধরে এ এলাকাতেই বসবাস করা নজরুল ইসলাম বলেন, “পঞ্চাশ বছর বয়সে এমন গ্রামীণ রাস্তা প্রথম দেখলাম। হাঁটলেও ভালো লাগে, চোখ জুড়ায়।” শুধু দর্শনার্থী নয়, কৃষকরাও সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে। প্রভাকরদী–ফরিদা বাজার সড়কে চাষাবাদ করা হাসান আলী বলেন, আগে রাস্তাঘাট খারাপ থাকায় ট্রলি–ভ্যান একদমই আসতে চাইত না, ফলে পণ্য বাজারে নেওয়া ছিল মহা ঝামেলা। এখন রাস্তাটি এত ভালো যে ফসল তুলে সঙ্গে সঙ্গে বাজারে যেতে পারছি, সময় কমছে, খরচও কমছে, ফলে লাভ বাড়ছে।

নতুন এই সড়কগুলো এখন অনেকটা পারিবারিক আড্ডাস্থলেও পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর টুকটাক বাতাসে লোকজন রাস্তায় হাঁটেন, শিশুরা সাইকেল চালায়, যুবকেরা ছবি তোলে। দোকানপাটেও এসেছে উচ্ছ্বাস; দর্শনার্থীর ভিড়ে roadside চায়ের দোকানগুলোতে বেড়েছে বেচাকেনা। স্থানীয় অর্থনীতিতে এ যেন নতুন প্রাণ ফেরার ইঙ্গিত। শুধু তাই নয়, স্কুল–কলেজগামী শিক্ষার্থীরা এখন কম সময়ে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারছে। আগে যেখানে কাদা আর গর্তের জন্য প্রতিদিন ভয়ে থাকতে হতো, এখন সেই রাস্তায় হাঁটার মধ্যে আছে স্বস্তি, সৌন্দর্য, আর নিরাপত্তা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আড়াইহাজারের ইউনিব্লক সড়ক শুধু কয়েকটি রাস্তার নাম নয়—এটি একটি পরিবর্তনের প্রতীক। বহু বছরের দুর্ভোগ, অবহেলা আর ভাঙাচোরা রাস্তার কালো অধ্যায়কে পেছনে ফেলে এখানে এখন তৈরি হয়েছে নতুন গল্প—দৃষ্টিনন্দন, টেকসই, পরিবেশবান্ধব গ্রামীণ সড়কের গল্প। স্থানীয়রা এখন এই রাস্তাকে শুধু চলাচলের পথ হিসেবে দেখছেন না; তারা এটিকে দেখছেন তাদের এলাকার পরিচয়, উন্নয়ন ও সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে। যে গ্রাম একসময় দুর্ভোগে জর্জরিত ছিল, সেই গ্রাম আজ অনেকে ঘুরে দেখতে আসে—এটাই উন্নয়নের প্রকৃত মূল্য। আড়াইহাজারে ইউনিব্লক সড়ক প্রমাণ করেছে, সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক বাস্তবায়ন আর মানুষের প্রত্যাশা মিললে গ্রামীণ উন্নয়ন কতটা দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে। এখানে এখন রাস্তা শুধু পথ নয়, মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দেওয়া এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত।

প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার

Read Previous

বিদেশি পর্যটকদের সোশ্যাল মিডিয়া ইতিহাস যাচাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ

Read Next

ব্রিস্টলের জাদুঘর থেকে ৬০০–র বেশি শিল্পকর্ম উধাও: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বড় ধাক্কা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular