
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (৯ নভেম্বর) রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এই বৈঠক হয়। এতে উভয় পক্ষ দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা, করব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা এবং সামাজিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করে।
বৈঠকে আইএমএফ দলের নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ মিশনের চিফ অ্যাডভাইজার ক্রিস পাপাজর্জিউ। অন্যদিকে বিএনপি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, বৈঠকে আইএমএফের চলমান মিশনের প্রাথমিক পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনের ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার হরমোনাইজেশন, কর ছাড় হ্রাস, কর্পোরেট ট্যাক্স নীতির পুনর্বিন্যাস, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সামাজিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি।
বিএনপি প্রতিনিধিদল বৈঠকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জিডিপি-টু-ট্যাক্স রেভিনিউ অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম হওয়ায় উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য সরকারকে ধারনির্ভর হতে হচ্ছে। তারা মনে করে, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে কর ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন এবং স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৈঠকে বলেন, “অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূলভিত্তি হলো আস্থা ও জবাবদিহিতা। জনগণের কাছে সরকারের আর্থিক নীতির ব্যাখ্যা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। কেবল তখনই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি সম্ভব।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক খাতের সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল পরিচালনা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কার্যকর সংস্কার ছাড়া স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
বৈঠকে বিএনপি পক্ষ থেকে সামাজিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তারা বলেন, দারিদ্র্য হ্রাস ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি স্থায়ী হবে না।
আইএমএফ প্রতিনিধি দল বিএনপির উপস্থাপিত নীতি-অগ্রাধিকার ও সংস্কারমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করে। তারা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য স্বচ্ছ আর্থিক নীতি, দায়বদ্ধ প্রশাসন ও সুশাসনের বিকল্প নেই। বৈঠকে উভয় পক্ষ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে সহযোগিতামূলক সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়।
বিএনপি নেতারা জানান, দলটি আইএমএফের পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং তাদের নিজস্ব নীতি প্রণয়নে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের চেষ্টা করবে। তারা মনে করেন, দেশের অর্থনীতি এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতি সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা ছাড়া বিকল্প নেই।
বৈঠক শেষে শায়রুল কবির খান বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সংলাপ কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক স্বচ্ছতারও অংশ। বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়সংগত করনীতি ও কার্যকর আর্থিক খাত গঠনের জন্য বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
এই বৈঠককে অনেকেই দেখছেন বাংলাদেশের আসন্ন অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতি পুনর্গঠনের সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএমএফ ও প্রধান রাজনৈতিক দলের এই সংলাপ ভবিষ্যতে দেশের আর্থিক কাঠামো ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



