
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: দেশের বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাইকে ঘিরে বেআইনিভাবে গড়ে উঠছে একের পর এক রিসোর্ট। রাঙামাটির জেলা প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই নির্মাণ করা হচ্ছে এসব অবকাশ কেন্দ্র। এতে হ্রদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়েছে।
গত ৫ থেকে ১০ বছরে রাঙামাটির সদর ও কাপ্তাই উপজেলায় অন্তত ২০টি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে কাপ্তাই হ্রদের পাশে রয়েছে অন্তত ১৫টি, বাকি ৫টি গড়ে উঠেছে কর্ণফুলী নদীর তীরে। রিসোর্টগুলোর অনেকটাই পাহাড় কেটে বা হ্রদের জমি দখল করে নির্মিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইন ও অনুমোদনের তোয়াক্কা নেই
পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ অনুযায়ী পাহাড়ি এলাকায় যেকোনো পর্যটন স্থাপনার জন্য জেলা পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু বেশিরভাগ রিসোর্টই এসব নিয়ম উপেক্ষা করে গড়ে তোলা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ বিধিমালার আওতায় জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার কথা থাকলেও, অধিকাংশ রিসোর্ট এ ব্যাপারে উদাসীন।
জেলা প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যটন সংবাদকে জানান, ‘‘এসব রিসোর্টের একটি পর্যন্তও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স নেয়নি। কেননা, লাইসেন্স পেতে হলে যেসব কাগজপত্র ও অনুমতিপত্র লাগে, তা তারা দিতে পারে না।’’
ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ ছাড়পত্রেও অনিয়ম
রাঙামাটির ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, রিসোর্টগুলোর মধ্যে মাত্র সাতটি অগ্নিনিরাপত্তা সনদ নিয়েছে। কিন্তু অনেক রিসোর্টেই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নেই, নেই মহড়ার ব্যবস্থাও। এমনকি যেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও পৌঁছাতে পারে না, সেখানে গড়ে উঠেছে বহু রিসোর্ট।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মাত্র তিনটি রিসোর্ট পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটা, নদী দখল এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। বরগাং ও বেড়াইন্ন্যে রিসোর্টে দেখা গেছে খোলা খাদে ফেলা হচ্ছে ময়লা ও প্লাস্টিক বর্জ্য।
পর্যটনের নামে প্রাকৃতিক বিপর্যয়
চুয়েটের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন নগর–পরিকল্পনাবিদ মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, “পরিকল্পনাহীনভাবে যেভাবে পাহাড়ে একের পর এক রিসোর্ট গড়ে উঠছে, তা পরিবেশের জন্য মারাত্মক। এতে পাহাড়ধস, অগ্নিকাণ্ডসহ নানাবিধ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। হ্রদ ও পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হুমকির মুখে পড়েছে।”
ব্যয়বহুল থাকার খরচ, কম দায়বদ্ধতা
এসব রিসোর্টে থাকার খরচও সাধারণ পর্যটকদের নাগালের বাইরে। প্রতি রাতের জন্য গড়ে ২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। অথচ রিসোর্ট মালিকদের অনেকেই আইন মানছেন না। তাদের দাবি, অনুমোদন পেতে নানা জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়।
নিয়ন্ত্রণে আসবে কি বেসরকারি পর্যটন?
পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেন, ‘‘আগে কী হয়েছে জানি না। তবে এখন থেকে সব রিসোর্ট নির্মাণের আগে পরিষদের অনুমতি নিতে হবে।’’ পরিবেশ অধিদপ্তরও জানিয়েছে, অনুমোদনবিহীন রিসোর্টগুলোকে নোটিশ দেওয়া হবে।
তবে স্থানীয় প্রশাসনের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ কাপ্তাই হ্রদের দখল নিয়ে ২০২২ সালে প্রতিবেদন প্রকাশের পরেও বাস্তবতায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বিশেষ তথ্য:
অনুমোদনপ্রাপ্ত রিসোর্ট:
- পরিবেশ ছাড়পত্র: পলওয়েল পার্ক, প্যানোরমা জুম রেস্তোরাঁ, নিসর্গ পড হাউস
- অগ্নিনিরাপত্তা সনদপ্রাপ্ত: বার্গী লেক ভ্যালি, বেড়াইন্ন্যে, ইজর, রাইন্ন্যা টুগুন, রাঙা দ্বীপ, নীলাঞ্জনা, বরগাং
নিয়ম না মানা রিসোর্টের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
চন্দ্রলোক ক্যাম্পেইন সাইড, কাপ্তাই কায়েক ক্লাব, জন হালদারের রিসোর্ট (নির্মাণাধীন ও নোটিশপ্রাপ্ত)



