
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের কোল ঘেঁষে পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে বালা হিসার দুর্গ—যা আজও আফগান ইতিহাস, যুদ্ধ ও রাজনীতির জীবন্ত সাক্ষ্য হয়ে আছে। শতাব্দী ধরে কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি ও শাসকদের আসন হিসেবে ব্যবহৃত এই দুর্গ সাম্প্রতিক সময়ে আবারও পর্যটকদের নজর কাড়ছে।
ইতিহাসের পাতায় বালা হিসার
ইতিহাসবিদদের মতে, বালা হিসারের বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। মুঘল সম্রাট বাবর এখানে তার কাবুল প্রশাসনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে আহমদ শাহ দুররানি, আফগান রাজবংশ এবং ১৯শ শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় ইংরেজ-আফগান যুদ্ধেও দুর্গটি ছিল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র।
ব্রিটিশ বাহিনী ও আফগান প্রতিরোধের সংঘর্ষে দুর্গটি একাধিকবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার আফগান রাজা শের আলি খান ও আবদুর রহমান খানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করেন। বলা হয়, বালা হিসার কাবুলের রাজনৈতিক ভাগ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য
“বালা হিসার” শব্দের অর্থ “উঁচু দুর্গ”। নামের সঙ্গে বাস্তবের মিল পুরোপুরি মেলে—দুর্গটি পাহাড়ি উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে পুরো কাবুল শহরকে চোখের সামনে পাওয়া যায়।
দুর্গটি মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল—
- উচ্চ দুর্গ (Upper Citadel): এখানে রাজপরিবার ও শাসকদের প্রশাসনিক ভবন ছিল।
- নিম্ন দুর্গ (Lower Citadel): এখানে ছিল সেনা ব্যারাক, অস্ত্রাগার, অশ্বারোহী ঘাঁটি ও বাজার।
আজও এর প্রাচীর, ফটক, নজরদারি টাওয়ার ও ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদের অবশিষ্টাংশ অতীতের কাহিনি শুনিয়ে যায়।
সংরক্ষণ প্রচেষ্টা
দীর্ঘ যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধের ধাক্কায় দুর্গের অনেকাংশ ধ্বংস হয়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগান প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় সংরক্ষণ ও পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। কিছু অংশ এখন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে, যেখানে ইতিহাসপ্রেমীরা প্রাচীন স্থাপত্য কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছেন।
২০২১ সালে আফগানিস্তানের নতুন প্রশাসন ঘোষণা দেয়, বালা হিসারকে একটি জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যান (Archaeological Park) হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এর ফলে আগামীতে এখানে জাদুঘর, পর্যটক সেন্টার এবং গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।
পর্যটকদের অভিজ্ঞতা
বালা হিসার ভ্রমণে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে কাবুল শহরের প্যানোরামিক দৃশ্য। সূর্যাস্তের সময় পাহাড় ও শহরের মিলনক্ষেত্র যেন এক অপূর্ব ছবি আঁকে।
স্থানীয় গাইডরা দুর্গের প্রতিটি অংশ ঘুরে ঘুরে দেখান, আর বলেন শাসকদের উত্থান-পতনের গল্প। পর্যটকরা জানান, এখানে দাঁড়িয়ে আফগান ইতিহাসের ঘ্রাণ পাওয়া যায়, যা কেবল বইয়ে পড়লে বোঝা সম্ভব নয়।
পর্যটন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বালা হিসার দুর্গ শুধু কাবুল নয়, গোটা আফগানিস্তানের পর্যটন খাতের জন্য এক সোনালী সুযোগ। যদি নিরাপত্তা ও ভ্রমণ অবকাঠামো জোরদার করা যায়, তবে এটি মধ্য এশিয়ার শীর্ষ পর্যটন কেন্দ্রগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে।
তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নিরাপত্তা। বিদেশি পর্যটকদের এখনও সাবধানে পরিকল্পনা করে ভ্রমণ করতে হয়। পাশাপাশি, উন্নত রাস্তা, হোটেল এবং পর্যটকবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
কীভাবে যাওয়া যায়
- অবস্থান: কাবুল শহরের দক্ষিণ-পূর্বাংশে, কেন্দ্র থেকে গাড়িতে ২০–৩০ মিনিটের পথ।
- যাতায়াত: স্থানীয় ট্যাক্সি ও প্রাইভেট গাড়ি সহজলভ্য। নিরাপত্তাজনিত কারণে গাইড বা স্থানীয় ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যাওয়া উত্তম।
- প্রবেশ: বর্তমানে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও নির্দিষ্ট অনুমতি নিয়ে দুর্গে প্রবেশ করা যায়।
ভ্রমণের সেরা সময়
কাবুলে গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত গরম হয় না, তবে শীতকালে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। মার্চ থেকে মে এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর—এই সময় বালা হিসার ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করেন ভ্রমণকারীরা।
কাবুলের বালা হিসার দুর্গ শুধু একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনা নয়; এটি আফগান ইতিহাসের নিরব সাক্ষী। যুদ্ধ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির বহু অধ্যায় এখানে জমা হয়ে আছে। নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের উদ্যোগ সফল হলে এটি আফগানিস্তানের পর্যটন মানচিত্রে আন্তর্জাতিক মানের গন্তব্য হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে।



