হারমনি ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধন: টেকসই সাংস্কৃতিক পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল সরকার

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের পর্যটন খাতে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে হারমনি ফেস্টিভ্যাল। টেকসই সাংস্কৃতিক পর্যটন, সম্প্রদায়-ভিত্তিক উন্নয়ন এবং স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই বর্ণাঢ্য উৎসব আজ শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া চা বাগান প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম উৎসবের উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে সরকার পর্যটন খাতকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। জাতিগত পর্যটনের প্রসারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতির চাঙ্গা করার বিভিন্ন উদ্যোগ ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তিনি আরও জানান, সরকার আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি জাতিগত সাংস্কৃতিক একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।

এই উৎসবের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার, হস্তশিল্প, পোশাক, অলঙ্কার এবং জীবনযাত্রার নানা দিক তুলে ধরা হচ্ছে। ফুলছড়া চা বাগানের সবুজ প্রকৃতির মাঝে ২৭টি স্টল সাজানো হয়েছে, যেখানে মণিপুরি, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতালসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা তাদের সাংস্কৃতিক নিদর্শন প্রদর্শন করছেন। দর্শনার্থীরা ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, গান, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং হাতে তৈরি পণ্য কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। এই আয়োজন শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রাশিদুজ্জামান মিল্লাত উৎসবে বক্তব্যকালে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের কথা উল্লেখ করে বলেন, কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন, জাতিগত পর্যটন এবং জল পর্যটনের মাধ্যমে দেশের আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। তিনি জানান, বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড (বিটিবি) এই সম্প্রীতি উৎসবের মাধ্যমে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের বিপন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও অনন্য জীবনধারা বিশ্বের পর্যটকদের জন্য এক অসাধারণ আকর্ষণ। এই উৎসব দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পদ তুলে ধরবে এবং টেকসই পর্যটনের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেবে।”

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সাংসদ এম. নাসের রহমান, মৌলভীবাজার-৪ আসনের সাংসদ মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী, মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতারসহ স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। সকলে একযোগে এই উৎসবকে সফল করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

হারমনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২-এর এই আয়োজন শ্রীমঙ্গল ও আশেপাশের এলাকায় গোষ্ঠীভিত্তিক পর্যটনকে নতুন গতি দেবে। ইতিমধ্যে মণিপুরি সম্প্রদায়ের উদ্যোগে চালু হওয়া সম্প্রদায়-ভিত্তিক পর্যটন মডেল স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই উৎসবের মাধ্যমে সেই সাফল্যকে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতি বছর শ্রীমঙ্গলে একটি নির্দিষ্ট তারিখে এই সম্প্রীতি উৎসব আয়োজন করা হবে। এটি ট্যুর অপারেটরদের ইনবাউন্ড ট্যুরিজম প্যাকেজ তৈরিতে সহায়তা করবে এবং বিদেশি পর্যটকদের আগাম পরিকল্পনা করার সুযোগ করে দেবে। সিলেট বিমানবন্দর সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও এই লক্ষ্যকে আরও শক্তিশালী করবে। মন্ত্রী আফরোজা খানম সিলেটকে বিশ্ব মানচিত্রে একটি প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার করেছেন।

এই উৎসবের গুরুত্ব আরও বেশি কারণ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি ও চা-বাগান অঞ্চলগুলোতে জাতিগত বৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকদেরই আকৃষ্ট করে না, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের ইমেজকে উজ্জ্বল করে। টেকসই পর্যটনের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা, স্থানীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন একসাথে অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

হারমনি ফেস্টিভ্যাল শুধু তিন দিনের একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিশনের অংশ। এর মাধ্যমে স্থানীয় যুবক-যুবতীরা তাদের সাংস্কৃতিক পণ্য উৎপাদন ও বিপণনে দক্ষতা অর্জন করবে, পর্যটন সংশ্লিষ্ট ছোট ছোট উদ্যোগ গড়ে উঠবে এবং দেশের পর্যটন শিল্প আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠবে।

উৎসব চলাকালীন দর্শনার্থীরা শুধু দেখবেন না, অংশগ্রহণও করতে পারবেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে। এতে সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আরও দৃঢ় হবে। সরকারের এই উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন খাত শুধু অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে না, বরং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি লাভ করবে।

হারমনি ফেস্টিভ্যালের এই আয়োজন তাই শুধু একটি উৎসব নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক সমন্বিত প্রচেষ্টা। আগামী তিন দিন শ্রীমঙ্গল হয়ে উঠবে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মিলনমেলা।

Read Previous

বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে বিশ্ব দরবারে ব্র্যান্ডিং: সম্ভাবনা ও কৌশল

Read Next

চীনের গুয়াংজু মডার্ন ক্যান্সার হাসপাতাল: বাংলাদেশি রোগীদের জন্য স্বল্প খরচে অত্যাধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular