
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত হরমুজ দ্বীপ আজও প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি হিসেবে পর্যটকদের মনে দাগ কাটছে। এই দ্বীপটি তার বহুবর্ণময় ভূখণ্ডের জন্য বিশ্বজুড়ে ‘রামধনু দ্বীপ’ নামে খ্যাত। বৃষ্টি, সূর্যালোক এবং উপরিভাগের খনিজ স্তরের ওপর নির্ভর করে এখানকার মাটির রং প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। দক্ষিণ ইরানের এই ছোট্ট দ্বীপটি পারস্য উপসাগরকে ওমান সাগরের সাথে যুক্তকারী হরমুজ প্রণালীর ঠিক মুখে অবস্থিত। প্রায় ৪১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই দ্বীপ মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে। একদিকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথের কৌশলগত গুরুত্ব, অন্যদিকে নগরায়ণ থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক নির্জন স্বর্গ—এই দ্বৈত সত্তাই হরমুজকে অনন্য করে তুলেছে।
ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে হরমুজ দ্বীপের গঠন একেবারে অদ্ভুত। এটি গড়ে উঠেছে একটি ‘লবণ গম্বুজ’ থেকে। ভূগর্ভের গভীর থেকে লবণ ও পাথরের স্তর উঠে আসার ফলে সৃষ্ট এই কাঠামোয় বিভিন্ন খনিজ পদার্থ উপরে চলে এসেছে। ফলে দ্বীপের পৃষ্ঠে তৈরি হয়েছে স্বতন্ত্র রঙের স্তরবিন্যাস। নাসা আর্থ অবজারভেটরির তথ্য অনুসারে, এই লবণ গম্বুজের কারণেই এখানকার মাটিতে এমন অসাধারণ রঙের সমাহার দেখা যায়। গাঢ় লাল, কমলা, হলুদ থেকে শুরু করে সবুজ, বেগুনি—মোট ৭০টিরও বেশি রঙের স্তর পরস্পর জড়িয়ে রয়েছে এখানে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জমা হওয়া খনিজ পদার্থই এই রঙের মূল উৎস। লাল মাটির পেছনে রয়েছে আয়রন অক্সাইডের উচ্চ উপস্থিতি, আর হলুদ-কমলা-বাদামি আভা আসে অন্যান্য যৌগ থেকে। জল ও বাতাসের সংস্পর্শে এসে মাটির স্তরগুলো সূক্ষ্মভাবে পরিবর্তিত হয়। ফলে আবহাওয়া ও আলোর সাথে সাথে দ্বীপের ভূদৃশ্যও বদলে যায়। দিনের বিভিন্ন সময়ে একই জায়গা দেখায় ভিন্ন ভিন্ন রূপে।
শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, এই বর্ণিল মাটি স্থানীয় জনজীবনের সঙ্গেও মিশে গেছে গভীরভাবে। লাল মাটির প্রাধান্য এখানে সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়রা এই মাটিকে ‘সুরাখ’ বা ‘গেলাক’ নামে ডাকেন এবং ঐতিহ্যবাহী রান্নায় ব্যবহার করেন। মশলা হিসেবে বিভিন্ন খাবার ও পেস্ট্রিতে মেশানো হয় এটি, যা খাবারকে দেয় স্বতন্ত্র রং ও স্বাদ। প্রকৃতির এই উপহার শুধু খাবারেই সীমাবদ্ধ নয়। অ্যাটলাস অবসকিউরা জানায়, বহুবর্ণ মাটি স্থানীয় শিল্পীদের জন্যও এক অনন্য মাধ্যম। লাল, হলুদ ও কমলা মাটি দিয়ে তৈরি হয় চিত্রকলা, কারুশিল্প এবং গোষ্ঠীগত শিল্প প্রকল্প। প্রতি বছর শিল্পীরা একত্রিত হয়ে হাজার হাজার বর্গমিটার জুড়ে বিশাল ‘বালির গালিচা’ তৈরি করেন। সেখানে ফুটে ওঠে পারস্যের পৌরাণিক কাহিনী ও সাংস্কৃতিক প্রতীক। এভাবে ভূদৃশ্যই হয়ে উঠেছে দ্বীপের সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আধুনিক পর্যটনের সঙ্গে প্রকৃতির সমন্বয় ঘটাতে হরমুজে গড়ে উঠেছে এক অনন্য স্থাপত্য। পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত মাজারা রেসিডেন্স কমপ্লেক্স ‘প্রেজেন্স ইন হরমুজ’ প্রকল্পের অংশ। স্থানীয় স্থাপত্য সংস্থা জাভ আর্কিটেক্টসের নকশায় নির্মিত এই কমপ্লেক্সে রয়েছে ২০০টি গম্বুজ। চারপাশের ভূদৃশ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিটি গম্বুজে ব্যবহার করা হয়েছে উজ্জ্বল রং। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য—প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না করে বিদ্যমান ভূদৃশ্যকে কাজে লাগিয়ে টেকসই পর্যটন মডেল তৈরি করা। এই স্থাপনা দেখলে বোঝা যায়, মানুষ কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে।
দ্বীপের আরেক আকর্ষণ ‘লবণ দেবী’। পশ্চিমে অবস্থিত এই প্রাকৃতিক লবণের পাহাড় বড় বড় স্ফটিকের স্তর দিয়ে গঠিত। ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপের সময় ভূপৃষ্ঠে উঠে আসা লবণের স্তর বাতাস ও জলের ক্ষয়ে গড়ে তুলেছে এই অনন্য আকৃতি। বহুবর্ণ মাটির বিপরীতে সাদা লবণের স্ফটিকগুলো তৈরি করে আকর্ষক বৈপরীত্য। এছাড়া দ্বীপের উত্তরে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন এবং তুলনামূলকভাবে অক্ষত উপকূলীয় অঞ্চল। এটি বহু প্রজাতির পাখি ও সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল। ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এই জীববৈচিত্র্য হরমুজকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিয়েছে কঠোর পদক্ষেপ। অনেক এলাকায় পর্যটকদের ব্যক্তিগত মোটরযান ব্যবহার নিষিদ্ধ। পরিবর্তে সাইকেল, বৈদ্যুতিক যান অথবা পায়ে হেঁটে ভ্রমণে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে ক্ষয়প্রবণ মাটি ও খনিজ স্তরের ওপর চাপ কমছে। ব্যস্ত নৌপথের মাঝে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও হরমুজ গণপর্যটন থেকে অনেকটা দূরে। এখানে বড় মাপের নির্মাণকাজ প্রায় নেই। বেশিরভাগ এলাকাই এখনও প্রাকৃতিক। অনেক প্রতিবেদনে এটিকে ‘অপরিচিত পর্যটন কেন্দ্র’ বলা হয়। কারণ এখানে ভূতত্ত্বই অবকাঠামোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ দ্বীপ শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে এক অসাধারণ সম্পর্কের উদাহরণ। যেখানে রঙ বদলায় প্রতি মুহূর্তে, যেখানে মাটি হয়ে ওঠে খাবারের অংশ, শিল্পের মাধ্যম এবং স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা—সেখানে পর্যটনও হয়ে ওঠে দায়িত্বশীল ও টেকসই। যারা এখনও এই দ্বীপ দেখেননি, তাদের জন্য হরমুজ অপেক্ষা করছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা নিয়ে। প্রকৃতির এই রামধনু রঙের দ্বীপ যেন বলছে—সৌন্দর্য শুধু দেখার নয়, তাকে রক্ষা করারও।


