
পর্যটন সংবাদ | নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে ভ্রমণ, শিক্ষা এবং বিভিন্ন বিদেশগমন ভিসার আবেদনকারীদের লক্ষ্য করে প্রতিনিয়ত প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসে আছে কিছু অসাধু ট্রাভেল এজেন্সি। ‘নিশ্চিত ভিসা’, ‘১০০% গ্যারান্টি’ বা ‘নো ভিসা, নো ফি’ ধরনের লোভনীয় প্রচারণার মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তারপর হাওয়া হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ বড় বড় শহরে অসংখ্য ভুয়া বা অদক্ষ ট্রাভেল এজেন্সি জন্ম নিচ্ছে, যাদের নেই কোনো বৈধ রেজিস্ট্রেশন, নেই কোনো বিদেশি দূতাবাসের স্বীকৃতি। শিক্ষা বা কাজের ভিসার লোভ দেখিয়ে তারা কাগজপত্র তৈরির অজুহাতে লক্ষাধিক টাকা নিয়ে থাকে। পরে দেখা যায়, ভিসার কোনো আবেদনই হয়নি, কিংবা হয়েছে জাল তথ্য দিয়ে, যা অবশেষে বাতিল হয়।
ভুক্তভোগীদের কণ্ঠে হতাশা
মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, একজন ভুক্তভোগী, জানান:
“আমি একটি পরিচিত ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে কানাডার স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন করি। তারা ৩ লাখ টাকা অগ্রিম নেয়। কাগজপত্রের কাজ শেষ বলে তারা জানালেও পরে বুঝি, আসলে কিছুই হয়নি। এখন তারা ফোনও ধরছে না।”
শুধু সাইফুলই নন, এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন অসংখ্য তরুণ-তরুণী, যারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে ভিসা প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
পর্যটন বিশেষজ্ঞ এবং ইমিগ্রেশন পরামর্শদাতা ফারহানা জাহান বলেন:
“অনেকেই ভিসা সংক্রান্ত বিষয়ে না জেনে অসতর্কভাবে ট্রাভেল এজেন্সির ফাঁদে পড়ছেন। বাংলাদেশে ট্রাভেল ব্যবসা চালাতে হলে পর্যটন কর্পোরেশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এসব ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা আইনত দণ্ডনীয়।”
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ
অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন এসব প্রতারক প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন মানুষ ঠকিয়ে যাচ্ছে, অথচ তেমন কোনো আইনি পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। ভুক্তভোগীরা একাধিকবার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করলেও বিচার পেতে সময় লেগে যাচ্ছে অনেক বছর।
কীভাবে প্রতারণা থেকে বাঁচবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
- কোনো ট্রাভেল এজেন্সিতে টাকা দেওয়ার আগে তাদের ট্রেড লাইসেন্স, সরকারি অনুমোদন এবং পূর্বের কাজ যাচাই করুন।
- ‘১০০% গ্যারান্টি’ বা ‘ভিসা না হলে টাকা ফেরত’— এসব লোভনীয় অফারে না পা দেওয়াই ভালো।
- স্বীকৃত কনসালটেন্সি ফার্ম বা সরকারি তালিকাভুক্ত এজেন্সির মাধ্যমেই ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন।
- টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে রসিদ গ্রহণ করুন এবং ডিজিটাল লেনদেনের চেষ্টা করুন।
আইনি রেফারেন্স ও দণ্ডনীয় দিক
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রতারণা সরাসরি বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিচে প্রাসঙ্গিক ধারাগুলোর উল্লেখ করা হলো:
🔹 ধারা ৪১৭ – প্রতারণা:
যে ব্যক্তি অন্যকে প্রতারিত করে ক্ষতি সাধন করে, সে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড, বা জরিমানা, বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
🔹 ধারা ৪২০ – প্রতারণার মাধ্যমে সম্পত্তি আত্মসাৎ:
যদি কেউ প্রতারণার মাধ্যমে টাকা-পয়সা বা সম্পত্তি আত্মসাৎ করে, তার বিরুদ্ধে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয়দণ্ড হতে পারে।
এই ধারাই ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োগযোগ্য।
🔹 ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯
আইনের ধারা ৪৪ অনুসারে, প্রতারণার মাধ্যমে পণ্য বা সেবা প্রদান করলে প্রতিষ্ঠানকে দণ্ডনীয় অপরাধে অভিযুক্ত করা যায়, এবং এতে রয়েছে ১-৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা।
🔹 পর্যটন ব্যবসা (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০১৪
এই বিধিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পর্যটন সংক্রান্ত সেবা প্রদান করতে চাইলে তাকে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের লাইসেন্স নিতে হবে।
এ লাইসেন্স ব্যতীত ট্রাভেল এজেন্সি চালানো আইনবিরুদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য।
আইনি ব্যবস্থা না নিলে প্রতারকচক্র আরও সক্রিয় হবে
আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তাহমিনা হোসেন বলেন:
“এসব প্রতারকের বিরুদ্ধে কেবল সাধারণ ডায়েরি নয়, বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ও ভোক্তা অধিকার আইনের আওতায় মামলা করা প্রয়োজন। কিন্তু বেশিরভাগ ভুক্তভোগী সময়, প্রক্রিয়া এবং বিচারহীনতার ভয়ে আইনি লড়াইয়ে যেতে চান না।”
তিনি আরও বলেন, পুলিশ ও র্যাবের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের উচিত অনলাইনে সক্রিয় এসব প্রতারক এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
বাংলাদেশের যুব সমাজের একটি বড় অংশ উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যেতে চায়। অথচ এই স্বপ্নটিকে পুঁজি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তাদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই প্রতারণা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।



