নরিতাগামী বিমানের ফ্লাইট বন্ধে সমালোচনার ঝড়: কৌশলগত স্বার্থে আঘাত বলছেন বিশেষজ্ঞরা

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: ঢাকা-নরিতা-ঢাকা রুটে সরাসরি ফ্লাইট হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। দেশি-বিদেশি বিমান বিশেষজ্ঞ ও জাপানপ্রবাসী বাংলাদেশিরা এই সিদ্ধান্তকে “অদূরদর্শী” ও “অলজিক্যাল” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

গত মঙ্গলবার (১ জুলাই) থেকে এ রুটে ফ্লাইট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির কারণে তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাপানে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল বিমানের কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী নয়, বরং বাংলাদেশের বৈশ্বিক বিমানচিত্রকেও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে। তারা মনে করছেন, ক্ষতি কমিয়ে আনা কিংবা ব্যবসায়িক পরিকল্পনার মাধ্যমে রুটটি লাভজনক করার চেষ্টা না করে একেবারে বন্ধ করে দেওয়াটা দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত।

সাবেক বিমান বোর্ড সদস্য ও বিমান খাত বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “জাপানের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যের ফ্লাইট বন্ধ করা অত্যন্ত দুঃখজনক। যেখানে প্রবাসী, ব্যবসা ও পর্যটন—তিনটিই বিদ্যমান, সেখানে সঠিক পরিকল্পনার অভাবই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।”

অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, “বিমান শুধুমাত্র শ্রমিক যাত্রীদের নিয়ে ভাবছে, প্রিমিয়াম যাত্রীদের উপেক্ষা করছে। এটা হলে কখনোই লাভজনক হওয়া যাবে না। আর সরকার-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে উন্নয়ন সম্ভব নয়।”

উল্লেখ্য, দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা-নরিতা রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালু করে বিমান, যেখানে আধুনিক বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ব্যবহার করা হয়। যাত্রীরা দীর্ঘ ট্রানজিটের ঝামেলা ছাড়া মাত্র ৮ ঘণ্টায় জাপান পৌঁছাতে পারছিলেন।

বিমান সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত এ রুটে ২২৫টি ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে, যেখানে ৮৪ হাজার ৬৭৪ যাত্রী ও ২,৩৬৫ টন কার্গো পরিবহন করা হয়। যদিও গড় আসন পূরণের হার ছিল ৬৯%, তথাপি মোট ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১৫.৫৮ কোটি টাকা।

বিমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুর রহমান জানান, “প্রতিটি ফ্লাইটে গড়ে ৯৫ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছিল। বোর্ড সবদিক বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “বিমান ও ক্রুর স্বল্পতাও ফ্লাইট বন্ধের অন্যতম কারণ।”

অবশ্য প্রবাসী ও বিমানখাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ক্ষতির অজুহাতে এ রুট বন্ধ না করে বিকল্প কৌশল বা রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগটি টিকিয়ে রাখা উচিত ছিল। কারণ সম্প্রতি জাপান বাংলাদেশের জন্য আগামী পাঁচ বছরে ১ লাখ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

“এমন একটি সময়ে, যখন জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করার সুযোগ এসেছে, তখন ফ্লাইট বন্ধ করা অত্যন্ত হতাশাজনক,” বললেন একজন প্রবাসী যাত্রী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক রুট হঠাৎ চালু ও বন্ধ করলে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়, যা পর্যটন, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তাদের আহ্বান—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যেন বাস্তবভিত্তিক ও দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে পুনরায় ঢাকা-নরিতা রুট চালুর উদ্যোগ নেয়।

Read Previous

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে হজ ফ্লাইট আটকে: যান্ত্রিক ত্রুটিতে বিঘ্নিত উড়োজাহাজ চলাচল

Read Next

ভিসা প্রক্রিয়ার নামে প্রতারণা: অসাধু ট্রাভেল এজেন্সির ফাঁদে পড়ছে হাজারো ভিসা প্রত্যাশী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular