নিসর্গের নতুন ঠিকানা: পূর্ব সুন্দরবনের আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজম সেন্টারে শুরু হচ্ছে নতুন পর্যটন যাত্রা

ছবি: সংগৃহীত

ছবিপর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অরণ্যভূমি সুন্দরবন, যার নাম উচ্চারণেই ভেসে আসে প্রকৃতির গাঢ় সবুজ সৌরভ, নদীর নোনাজল আর বন্য জীবনের রহস্য। সেই সুন্দরবনের পূর্ব অংশে, শরণখোলা রেঞ্জের অন্তর্গত আলীবান্দা এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন এক পর্যটন কেন্দ্র—‘আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার’।

চলতি নভেম্বর থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হচ্ছে পর্যটকদের জন্য। প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষদের জন্য এটি হতে যাচ্ছে নতুন এক আকর্ষণ, যেখানে মিলবে ম্যানগ্রোভ বনের নিসর্গ, নদীর স্রোত, পাখির কোলাহল আর অনাবিল শান্তি।

সুন্দরবনের বুক চিরে নতুন পর্যটন সম্ভাবনা

আলীবান্দা নামটি হয়তো অনেকের কাছে নতুন, কিন্তু যারা একবার সেখানে গেছেন তারা বলেন—এ জায়গাটির সৌন্দর্য অন্যরকম। শরণখোলা রেঞ্জ অফিস থেকে মাত্র ৪০ মিনিটের নৌযাত্রা পেরোলেই চোখে পড়ে এক বিস্ময়কর দৃশ্যপট। নদীর দুই তীরে ঘন সবুজ গেওয়া ও সুন্দরী গাছ, মাঝেমাঝে পাখির ঝাঁক, আর কচুরিপানায় মোড়া শান্ত জলরাশি—সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত চিত্রপট।

এই যাত্রাপথই পর্যটকদের কাছে এক আলাদা অভিজ্ঞতা। শহরের কোলাহল পেরিয়ে যখন নৌকা ধীরে ধীরে এগোয়, তখন বাতাসে মিশে থাকা লবণাক্ত গন্ধ আর প্রকৃতির শব্দ মানুষকে এক অন্যরকম প্রশান্তি দেয়।

আধুনিক অবকাঠামো, প্রকৃতির ভেতরে মানুষ

বন বিভাগ জানিয়েছে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজম সেন্টারের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়। এখানে তৈরি হয়েছে একাধিক দর্শনীয় স্থাপনা, যার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো ছয়তলা ভবনের সমান উচ্চতার ওয়াচ টাওয়ার। টাওয়ারে উঠলেই চোখে পড়ে দূর দূর পর্যন্ত বিস্তৃত সবুজ ম্যানগ্রোভ বন, নদীর আঁকাবাঁকা পথ, আর সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

এর পাশাপাশি রয়েছে প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ ফুট ট্রেইল (ওয়াকওয়ে)। এই ট্রেইলে হাঁটলে মনে হবে, আপনি যেন বনের নিঃশব্দ হৃদয়ে প্রবেশ করেছেন। পথের দুই পাশে ঘন গাছের ছায়া, মাঝে মাঝে কাঠবিড়ালি কিংবা হরিণের দেখা মিলতে পারে। প্রকৃতির সঙ্গে এমন সরাসরি সংযোগই আলীবান্দাকে করেছে অনন্য।

আরও আছে মিষ্টি পানির পুকুর, হরিণ রাখার সেড, জেটি, বিশ্রামাগার, সুভেনিয়ার শপ, এবং পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক বনরক্ষী ও স্থানীয় গাইডদের উপস্থিতি। সব মিলিয়ে, এটি এমন এক কেন্দ্র যেখানে আধুনিক পর্যটনের সুযোগ আর পরিবেশবান্ধব ভাবনা একসঙ্গে মিলেছে।

স্থানীয়দের চোখে নতুন সম্ভাবনা

এই প্রকল্প ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। শরণখোলার বাসিন্দা শাহিন বলেন,
“আলীবান্দা চালু হলে এখানকার অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। গাইড, নৌযানচালক, হোটেল ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র দোকানি—সবাই উপকৃত হবে। একই সঙ্গে মানুষ প্রকৃতি ও বনের প্রতি আরও সচেতন হবে।”

এই কথার পেছনে বাস্তবতা আছে। কারণ, স্থানীয় অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে বন ও নদীকে ঘিরে জীবিকার ওপর। পর্যটন কেন্দ্র চালু হলে সেই নির্ভরতা আরও টেকসই হবে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন মানে হচ্ছে, বন যেমন বাঁচবে, মানুষও উপার্জনের পথ পাবে।

প্রবেশ ফি নিয়ে বিতর্ক

তবে সব ইতিবাচকতার মাঝেও একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে—প্রবেশ ফি।
আলীবান্দায় প্রবেশের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪৫ টাকা, যা অনেকের কাছে বেশি মনে হচ্ছে।

শরণখোলা ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল বয়াতী বলেন,
“একই সুন্দরবনের করমজল পর্যটন পয়েন্টে প্রবেশ ফি মাত্র ৪৬ টাকা। আলীবান্দায় ফি এত বেশি হওয়ায় অনেকেই যেতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।”

তবে বন বিভাগ এই বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের ডিএফও রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন,
“আলীবান্দা ২০১৭ সালে ঘোষিত অভয়ারণ্য এলাকার অন্তর্ভুক্ত। তাই এখানে কিছু অতিরিক্ত বিধিনিষেধ রয়েছে। সেই কারণেই প্রবেশ ফি তুলনামূলক বেশি। তবে পর্যটকদের মতামত আমরা সরকারের কাছে পাঠাব।”

তার মতে, ফি কিছুটা বেশি হলেও এটি পর্যটন কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণের কাজেই ব্যয় হবে।

পরিবেশ ও পর্যটনের ভারসাম্য

আলীবান্দা শুধু একটি নতুন স্পট নয়, এটি হতে পারে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের একটি উদাহরণ। সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, যা ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য। এই বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি পর্যটনের সুযোগ তৈরি করাও এক ধরনের ভারসাম্যের কাজ।

বন বিশেষজ্ঞদের মতে, আলীবান্দার মতো প্রকল্প সফল হলে মানুষ বন সম্পর্কে আরও জানবে, সংরক্ষণের গুরুত্ব বুঝবে। পর্যটন থেকে আয় হলে স্থানীয় জনগণও বন রক্ষায় উৎসাহী হবে। তবে শর্ত একটাই—সব কিছু করতে হবে প্রকৃতির ক্ষতি না করে।

ভৌগোলিক সুবিধা ও সহজগম্যতা

আলীবান্দার আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর অবস্থান। বরিশাল বিভাগের মানুষদের জন্য এটি সবচেয়ে সহজগম্য সুন্দরবন স্পট। খুলনা বা মংলার মতো দীর্ঘ যাত্রাপথ পার হতে হয় না। স্বল্প সময়ে নৌপথে পৌঁছে যাওয়া যায়, যা সময় ও ঝুঁকি দুই-ই কমায়।

ফলে বরিশাল, পিরোজপুর, বাগেরহাট, এমনকি পটুয়াখালী থেকেও সহজে ঘুরে আসা সম্ভব। স্থানীয় পর্যটকরা ইতিমধ্যেই আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছেন। শীত মৌসুমে প্রতিদিনই সেখানে পর্যটকদের ভিড় বাড়বে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।

পর্যটন শিল্পে নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশে ইকো-ট্যুরিজম ধারণা এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। বেশিরভাগ পর্যটন কেন্দ্রেই এখনো পরিবেশ সচেতনতা ও টেকসই পরিকল্পনার অভাব দেখা যায়। সেই জায়গায় আলীবান্দা প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে নতুন ধাঁচের উদ্যোগ হিসেবে।

এখানে একদিকে যেমন পর্যটন অবকাঠামো উন্নত করা হয়েছে, অন্যদিকে বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কড়া নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে এটি হতে পারে ভবিষ্যতের জন্য এক রোল মডেল—যেখানে প্রকৃতি ও পর্যটন হাত ধরাধরি করে এগোবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা

বন বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মাসেই আলীবান্দায় হরিণ আনার পরিকল্পনা আছে। এতে দর্শনার্থীরা বনের জীবজগতের আরও কাছাকাছি আসার সুযোগ পাবেন। ভবিষ্যতে এখানে আরও বিশ্রামাগার, বনের ভেতর শিক্ষামূলক ট্রেইল, এবং স্থানীয় হস্তশিল্পের বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ডিএফও রেজাউল করিম চৌধুরীর ভাষায়,
“আমরা চাই মানুষ সুন্দরবনের প্রকৃত সৌন্দর্য দেখুক, কিন্তু সেই সঙ্গে যেন প্রকৃতি অক্ষুণ্ন থাকে। এ কারণেই সবকিছু ধীরে ও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”

আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার কেবল একটি নতুন পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি এক নতুন মানসিকতার প্রতিফলন—যেখানে প্রকৃতি শুধু দর্শনের বিষয় নয়, সংরক্ষণের অংশও বটে।

যারা শহরের কংক্রিট থেকে একটু মুক্তি চান, নদীর বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে চান, আর বনের নীরবতায় কিছু সময় কাটাতে চান—তাদের জন্য আলীবান্দা হতে পারে নতুন গন্তব্য।

এখন সবকিছু নির্ভর করছে ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতার ওপর। যদি প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে এই ভারসাম্য বজায় থাকে, তাহলে আলীবান্দা শুধু পূর্ব সুন্দরবনের নয়, পুরো দেশের পর্যটন মানচিত্রে হয়ে উঠবে এক উজ্জ্বল নাম।

Read Previous

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ই-গেট চালু: নিরাপত্তা ও সেবা উন্নয়নে নতুন অধ্যায়

Read Next

বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য নিউজিল্যান্ড ভ্রমণ ভিসা প্রসেসিং: সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular