
ঢাকা গেইট বা মীর জুলমা গেইট
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : ঢাকা শহরের ইতিহাস যত পুরনো, তার সাক্ষী ততটাই সমৃদ্ধ এই এলাকা—ঢাকা গেট ও পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। পুরান ঢাকার ব্যস্ত সড়ক, পুরনো স্থাপত্য আর আভিজাত্য মিশ্রিত স্মৃতিবিজড়িত এই স্থান এখনো পর্যটকদের কাছে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। ইতিহাসপ্রেমী, সংস্কৃতিপ্রেমী কিংবা সাধারণ ভ্রমণপিপাসু—যেই হোন না কেন, এই এলাকার পথে হাঁটলেই চোখে পড়বে ঢাকা শহরের অতীতের প্রতিচ্ছবি।
ঢাকা গেটের ইতিহাস: মোগল আমলের প্রবেশদ্বার
ঢাকা গেট, যা “বুড়িগঙ্গা গেট” বা “মোগল গেট” নামেও পরিচিত, একসময় ছিল প্রাচীন ঢাকার প্রধান প্রবেশদ্বার। ধারণা করা হয়, মোগল সুবেদার মির্জা নাথান বা প্রিন্স মোহাম্মদ আজম ঢাকায় প্রবেশের জন্য এই গেট নির্মাণ করেছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীতে।
সেই সময় গেটটি ছিল লাল ইটের তৈরি, উপরে খিলানাকৃতি প্রবেশপথ, দুই পাশে টাওয়ারসদৃশ অংশ এবং উপরে রাজকীয় আলংকারিক কাজ। মোগল শাসনামলে গেটটির গুরুত্ব ছিল প্রশাসনিক ও সামরিক দুই দিক থেকেই।
ব্রিটিশ আমলে কিছুটা সংস্কার হলেও, মূল কাঠামোটি পরবর্তীতে নষ্ট হতে থাকে। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে এর সংরক্ষণ চলছে।
পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা: শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতীক
ঢাকা গেটের পাশেই রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো এলাকা—যা দেশের উচ্চশিক্ষার সূতিকাগার বলা যায়। ১৯২১ সালে ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে স্থাপিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখনকার পূর্ববাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এর প্রাচীন ভবনগুলো, যেমন—কার্জন হল, ঢাবি সিনেট ভবন, জগন্নাথ হল, ও ফজলুল হক হল—স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকে অতুলনীয়।
কার্জন হলের লাল ইটের ভবন, গম্বুজ আর দৃষ্টিনন্দন খিলানগুলো একদিকে মোগল স্থাপত্যের ধাঁচ, অন্যদিকে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার এক অনন্য মেলবন্ধন। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার রাস্তা, গাছপালা, আর পুরোনো ভবনগুলো ঢাকার কোলাহলের মাঝেও এক প্রশান্তির আবহ এনে দেয়।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য: এক স্থানে ইতিহাসের সংমিশ্রণ
ঢাকা গেট ও পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরতে গেলে বোঝা যায়, এই অঞ্চল শুধু স্থাপত্য নয়—এটি সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—সবক্ষেত্রেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল নেতৃত্বের আসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই রয়েছে শহীদ মিনার, যা ভাষা শহিদদের স্মৃতিবিজড়িত এক পবিত্র স্থান। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে যান।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ
যদিও এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ, তবু ঢাকা গেট থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত রাস্তা ধরে হাঁটলে চোখে পড়ে বিশাল সব পুরনো গাছ, ছায়াঘেরা পথ আর পাখির ডাক।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সবুজ মাঠ, কলা ভবনের বাগান, আর টিএসসি এলাকার খোলা পরিবেশ—সব মিলিয়ে এটি শহরের ভেতরেই এক প্রশান্তির আশ্রয়।
সন্ধ্যা নামলে কার্জন হল বা নীলক্ষেতের চারপাশে আলোর ঝলকানি আর ছাত্রজীবনের কোলাহল যেন শহরের প্রাণ ফিরিয়ে আনে।
দর্শনীয় স্থানসমূহ
ঢাকা গেট ও পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আশেপাশে ঘুরে দেখার মতো কিছু উল্লেখযোগ্য জায়গা হলো—
১. ঢাকা গেট (Old City Gate) – ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বার।
২. কার্জন হল – স্থাপত্য ও ইতিহাসের অনন্য নিদর্শন।
৩. শহীদ মিনার – ভাষা আন্দোলনের প্রতীক।
৪. টিএসসি (Teacher Student Centre) – তরুণ সংস্কৃতির মিলনস্থল।
৫. জাতীয় জাদুঘর ও সুপ্রীম কোর্ট এলাকা – অল্প দূরেই অবস্থিত, দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয়।
৬. রামনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান – প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সেরা জায়গা।
যাতায়াত ব্যবস্থা
- বাস: গুলিস্তান, শাহবাগ, বা ফার্মগেট থেকে যেকোনো লোকাল বাসে সহজেই যাওয়া যায়।
- রিকশা/সিএনজি: পুরান ঢাকার ভেতরে চলাচলের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
- প্রাইভেট কার: ঢাকা গেটের কাছাকাছি পার্কিং ব্যবস্থা সীমিত, তাই রিকশা বা পায়ে হেঁটে ঘোরা সুবিধাজনক।
- হাঁটা: যারা ইতিহাস দেখতে ও ছবি তুলতে চান, তাদের জন্য হাঁটা ভ্রমণই সবচেয়ে উপযুক্ত।
ভ্রমণ খরচ
পুরান ঢাকার এই অংশ ঘুরতে গেলে প্রবেশমূল্য খুব একটা নেই।
- ঢাকা গেট: ফ্রি (সরকারি স্মৃতিসৌধ)
- কার্জন হল ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা: প্রবেশ ফ্রি, তবে জাদুঘর ভিজিটে টিকিট প্রয়োজন (বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য প্রায় বিশ–ত্রিশ টাকা, বিদেশিদের জন্য একশ টাকা পর্যন্ত)।
- খাবার ও যাতায়াত:
- রিকশা ভাড়া: পঞ্চাশ–একশ পঞ্চাশ টাকা (দূরত্বভেদে)
- খাবার: দুইশ–পাঁচশ টাকায় ভালো মানের লাঞ্চ পাওয়া যায়
- চা বা নাস্তা: বিশ–পঞ্চাশ টাকায় টিএসসি বা নীলক্ষেতে
থাকার ব্যবস্থা
যেহেতু পুরান ঢাকায় বড় হোটেল কম, তাই আশেপাশের এলাকায় থাকা সুবিধাজনক। কিছু প্রস্তাব:
১. হোটেল ৭১ (মতিঝিল) – তিন-স্টার মানের, রুমভাড়া প্রায় তিন হাজার–পাঁচ হাজার টাকা।
২. অরচিড প্লাজা হোটেল (গুলিস্তান) – মাঝারি মানের, ভাড়া দুই হাজার–সাড়ে তিন হাজার টাকা।
৩. গেস্ট হাউস ও এয়ারবিএনবি রুম (শাহবাগ বা পল্টন এলাকায়) – এক হাজার দুইশ–দুই হাজার পাঁচশ টাকায় পাওয়া যায়।
৪. বাজেট হোস্টেল (নিউমার্কেট বা নীলক্ষেত) – ছাত্র বা ব্যাকপ্যাকারদের জন্য আদর্শ, আটশ–এক হাজার দুইশ টাকায় থাকা যায়।
খাবার ও বিশ্রাম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে অসংখ্য ছোট রেস্টুরেন্ট ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকান রয়েছে।
- টিএসসি ক্যান্টিন – বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্বাদ পাওয়া যায় এখানে।
- বটতলা রেস্টুরেন্ট, নীলক্ষেত – স্থানীয় খাবার ও চা-কফির জন্য জনপ্রিয়।
- মাহবুব রেস্টুরেন্ট, শাহবাগ – বিরিয়ানি ও কাবাবের জন্য বিখ্যাত।
- চকবাজার ও আজিমপুরের খাবার দোকান – পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্বাদ।
পর্যটকদের জন্য টিপস
১. সকালে বা বিকেলে ঘুরলে আলো ও আবহ দুইই উপভোগ করা যায়।
২. শুক্রবারে ভিড় তুলনামূলক কম, তাই ফটো তোলার জন্য উপযুক্ত সময়।
৩. স্থানীয়দের কাছ থেকে জায়গার ইতিহাস জানলে অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হয়।
৪. গরমের সময় টুপি, পানির বোতল, ও হালকা পোশাক রাখুন।
ঢাকা গেট ও পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা শুধু ইতিহাসের স্থান নয়, এটি ঢাকার আত্মা। এখানে এসে বোঝা যায়, এই শহর কেবল ইট-পাথরের নয়—এটি এক জীবন্ত ঐতিহ্য, যেখানে শিক্ষা, সংস্কৃতি, আন্দোলন ও জীবন একসূত্রে গাঁথা।
যে কেউ ঢাকায় ভ্রমণে এলে এই স্থান না দেখলে যেন পুরো ইতিহাসই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ঢাকার পুরনো হৃদয়ে দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা—এটাই পুরান ঢাকার প্রকৃত সৌন্দর্য।



