চলনবিলে পানি নেই, পর্যটন ব্যবসায় মন্দা: প্রাকৃতিক রূপের অপেক্ষায় মানুষ

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি চলনবিল প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে রূপ নেয় এক অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে। থইথই পানিতে ভেসে ওঠা ধানখেত, মাছের ভান্ডার আর নৌবিহারের অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে হয়ে ওঠে অনন্য এক আনন্দভ্রমণ। কিন্তু এবছর চিত্র ভিন্ন। আষাঢ় মাস শেষ হলেও এখনো পুরোপুরি ভরেনি চলনবিল। ফলে থমকে গেছে পর্যটনের চাকা, বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত চলনবিলে সাধারণত জুনের শেষ দিক থেকে পানি জমতে শুরু করে। নদ-নদী যেমন বড়াল, শিবনদ, বারনই, ছোট যমুনা, আত্রাই, নাগর, বানগঙ্গা ও নন্দকুঁজা বেয়ে এই বিলে পানি আসে। কিন্তু এবছর অস্বাভাবিকভাবে যমুনা নদী পূর্ণ না হওয়ায়, উজান থেকে আসা পানিও নদীগুলোতে জমা না হয়ে সরাসরি যমুনায় নেমে যাচ্ছে। ফলে চলনবিলের বুকে এখনো সেই কাঙ্ক্ষিত পানির ছোঁয়া নেই।

পর্যটন সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে খ্যাত নাটোরের পাটুল, ডাহিয়া, সাতপুকুরিয়া ও বিলতাজপুর গ্রামে দেখা গেছে হতাশা। স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুর রাব্বানী বলেন, “প্রতিবছর এই সময়ে নৌকা চলে, পর্যটক আসে, আমাদের আয় হয়। এবার এখনো পানি আসেনি, তাই নৌকাও নামেনি।”

বিলের বুক চিরে চলে যাওয়া রাস্তা, দুই পাশজুড়ে সবুজ ধানখেত, মাঝেমধ্যে জমে থাকা অল্প পানিতে ভাসমান নৌকা—সব মিলিয়ে রোমান্টিক এক বর্ষার আবেশ থাকে এ এলাকায়। ছোট ছোট শিশু স্কুল থেকে ফেরার সময় নৌকায় চড়ে রাস্তা পেরোয়—এ দৃশ্য বহু পর্যটকের ক্যামেরায় বন্দী হয়। এবার সে দৃশ্যও নেই।

রাজশাহীর চারঘাট থেকে পদ্মা নদীর পানি বড়াল নদে ঢুকছে ঠিকই, কিন্তু স্রোতের গতি কম। নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রিফাত করিম জানান, “পানির উচ্চতা এখনো চলনবিলের উপযোগী হয়নি। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলাবে।”

চলনবিল ঘিরে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সাতপুকুরিয়ার নৌকা কারিগর মাহবুব প্রামাণিক বলেন, “বছরের এই সময় আমরা বাড়তি আয় করি। নৌকা মেরামত করি, ভাড়া দিই। এবার এখনো পানি না আসায় কাজ শুরুই করতে পারিনি।”

স্থানীয় পর্যটন সংগঠক পি এম আলমগীর বলেন, “আমরা ছোটবেলায় এখানে বিশ ফুট পর্যন্ত পানি দেখেছি। ঢেউয়ের শব্দে ঘুম ভাঙত। এখন আবাদের জন্য খনন করা নালা দিয়ে সব পানি নদীতে চলে যাচ্ছে, চলনবিল তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে।”

তবে বিল অঞ্চলের মানুষ এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন। বর্ষার শেষার্ধে যদি ভারী বৃষ্টি হয়, তাহলে চলনবিল আবারও জেগে উঠবে আপন মহিমায়। আর সে সঙ্গে প্রাণ ফিরে পাবে বিলকেন্দ্রিক পর্যটন এবং স্থানীয় অর্থনীতি।

ভ্রমণ পরিকল্পনা করছেন? অপেক্ষা করুন চলনবিলের রূপ ফিরে আসার। প্রকৃতির বৈচিত্র্য দেখতে হলে এখনই সময় স্থানীয় পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার।

Read Previous

অনুমোদনহীন রিসোর্টে ঝুঁকিতে কাপ্তাই হ্রদ ও পার্বত্য পরিবেশ

Read Next

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনস্রোত, জমজমাট পরিবেশে অনুষ্ঠিত জামায়াতের জাতীয় সমাবেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular