
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : এমিরেটস তাদের বহরজুড়ে এমন এক প্রযুক্তি আনছে, যা আকাশে ইন্টারনেট অভিজ্ঞতাকে পুরোই পাল্টে দেবে। স্পেসএক্সের স্টারলিংক ইনস্টলেশনের মাধ্যমে এয়ারলাইনটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্টারলিংক-সক্ষম ওয়াইড-বডি বহর গড়ে তুলতে চলেছে। পরিকল্পনা বেশ সোজা—২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে বোয়িং ৭৭৭ বিমানে যাত্রা শুরু, আর ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পুরো রোলআউট সম্পন্ন।
এমিরেটস আগে থেকেই ইনফ্লাইট কানেক্টিভিটিকে গুরুত্ব দেয়। এবার তারা সেই জায়গাটায় নতুন অধ্যায় খুলছে অতি-দ্রুত, স্থলমানের ইন্টারনেট সুবিধা দিয়ে। উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট—উড়োজাহাজে থাকা অবস্থায় যাত্রীরা আর ‘কম গতির, সীমিত সুবিধা’ ধরনের পুরোনো অভিজ্ঞতায় ফিরে যেতে হবে না।
২৩ নভেম্বর—স্টারলিংকের প্রথম যাত্রা
এমিরেটস নিশ্চিত করেছে, ২৩ নভেম্বর তাদের একটি বোয়িং ৭৭৭ নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে প্রথমবারের মতো স্টারলিংক সংযোগ নিয়ে আকাশে উঠবে। গাল্ফ নিউজের তথ্য অনুযায়ী, সেই ফ্লাইটেই যাত্রীরা প্রথমবার বিনামূল্যে আলট্রা-হাই-স্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন।
এটা শুধু “ওয়াই-ফাই সুবিধা” নয়। তারা বলছে—ভিডিও কল, এইচডি স্ট্রিমিং, অনলাইন গেম খেলা, ভারী ফাইল ডাউনলোড, সোশ্যাল মিডিয়া লাইভ—সব কিছুই হবে লাগেজ না খুলেই।
এমনকি, ৪০,০০০ ফুট উচ্চতাতেও সংযোগ থাকবে স্থলমানের মতো স্থিতিশীল। এটাই স্টারলিংকের শক্তি।
এয়ারশো থেকে যাত্রা শুরু
দুবাই এয়ারশোতে এমিরেটস তাদের প্রথম স্টারলিংক-সক্ষম বিমান—বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর (A6-EPAF)—সবার সামনে তুলে ধরেছে। মাটিতে দাঁড়িয়েও দর্শনার্থীরা সেখানে স্টারলিংকের গতির স্বাদ পেয়েছেন। সেই প্রদর্শনীর পরই এয়ারশোর প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী স্টারলিংক ফ্লাইট আকাশে উঠবে।
এই গতি নিয়ে এমিরেটস খুবই আত্মবিশ্বাসী। তারা মনে করে এটাই ভবিষ্যৎ—আর তারা এক ধাপ এগিয়ে আছে বাকিদের চেয়ে।
রোলআউটের গতি—মাসে প্রায় ১৪টি বিমান
এমিরেটস প্রতি মাসে অন্তত ১৪টি বিমানকে স্টারলিংক-সক্ষম করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে এয়ারবাস A380–এর ইনস্টলেশন শুরু হবে।
এখানে একটা দারুণ বিষয় আছে—
- প্রতিটি বোয়িং ৭৭৭-এ লাগানো হবে দুইটি স্টারলিংক অ্যান্টেনা
- বিশাল এয়ারক্রাফট A380–এ থাকবে তিনটি অ্যান্টেনা
ফলে পুরো কেবিন জুড়ে যাত্রীরা একই মানের কানেকশন পাবেন। এটা ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথমবার।
সব কেবিনে ফ্রি ওয়াই-ফাই—এক ক্লিকেই সংযুক্তি
এমিরেটস বলছে, স্টারলিংক যুক্ত সব বিমানে যাত্রীরা কেবিন শ্রেণি যাই হোক—ফার্স্ট, বিজনেস, প্রিমিয়াম ইকোনমি বা রেগুলার ইকোনমি—সবার জন্য ওয়াই-ফাই থাকবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
আরও সহজ করে বললে—
- কোনও অ্যাকাউন্ট লাগবে না
- কোনও স্কাইওয়ার্ডস লগ-ইন নয়
- কোনও পেমেন্ট পেজ নেই
- শুধু এক ক্লিক; বাকি কাজ স্টারলিংক করবে
ব্যক্তিগত মোবাইল থেকেও, আর সিটব্যাক স্ক্রিন থেকেও ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাবে। স্টারলিংকের মাধ্যমে লাইভ টিভিও আসবে—প্রথমে ব্যক্তিগত ডিভাইসে, এরপর ডিসেম্বর শেষে সিটব্যাক স্ক্রিনে।
এমিরেটসের প্রেসিডেন্ট টিম ক্লার্কের বক্তব্য
টিম ক্লার্ক স্পষ্ট বলেছেন—স্টারলিংকের সহযোগিতা এমিরেটসের জন্য বড় কৌশলগত পদক্ষেপ।
তার ভাষায়, যাত্রীরা যেন “আরও ভালোভাবে উড়ে”—এটাই লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য অর্জন করতে স্টারলিংককে কাজে লাগানো হচ্ছে। এতে উৎপাদনশীলতা, রিয়েল-টাইম যোগাযোগ, আর বিনোদন—সব ক্ষেত্রেই নতুন মানদণ্ড তৈরি হবে।
তিনি আরও জানান, এই রোলআউট এমিরেটসের বিস্তৃত কেবিন আপগ্রেড প্রকল্পের অংশ। যার মধ্যে আছে নতুন প্রিমিয়াম ইকোনমি, উন্নত বিজনেস ক্লাস, রিফ্রেশড ফার্স্ট ক্লাস, এবং উন্নত আইস এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেম।
স্টারলিংকের ভাষ্য
স্টারলিংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট চ্যাড গিবসের মতে, এমিরেটসের সাথে কাজ করা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ।
তিনি জানালেন, আকাশে থাকা অবস্থায় যাত্রীরা যেন ঠিক মাটিতে থাকা অবস্থার মতোই ভিডিও কল, গেমিং এবং স্ট্রিমিং করতে পারেন—এটাই স্টারলিংকের লক্ষ্য। দ্রুত ইনস্টলেশন এবং নিরবচ্ছিন্ন সার্ভিস নিশ্চিত করতেই তারা এমিরেটসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
বড় ছবি—এমিরেটসের কেবিন অভিজ্ঞতায় নতুন স্তর
স্টারলিংকের পাশাপাশি এমিরেটস এক্সপেরিয়েন্স সব দিক থেকেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। যাত্রীদের জন্য রয়েছে—
- ৬,৫০০-র বেশি বিনোদন চ্যানেল
- A380 অনবোর্ড লাউঞ্জ
- ফার্স্ট ক্লাস শাওয়ার স্পা
- আপগ্রেডেড কেবিন ফিনিশিং
এ পর্যন্ত ৭৬টি বিমান পুরোপুরি সংস্কার শেষ করেছে এমিরেটস, যা তাদের ২২০-বিমানের রেট্রোফিট কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
শেষ কথা
স্টারলিংক নিয়ে এমিরেটস যে জায়গায় যাচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে—এয়ারলাইনের ভবিষ্যৎ শুধু বিমানের উন্নয়নে নয়, কানেক্টিভিটির উন্নতিতেও নির্ভর করে। যাত্রী এখন আকাশেও কাজ করতে চায়, বিনোদন নিতে চায়, পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে লাইভ কানেক্ট থাকতে চায়।
এমিরেটস সেই চাহিদাটাই ধরেছে।
এটা শুধু ইনফ্লাইট ইন্টারনেট নয়— এটা বৈশ্বিক আকাশযাত্রায় এক নতুন মানদণ্ড।



