৪৮ কোটি ২০ লাখ ডলারে পিআইএ’র নিয়ন্ত্রণ বিক্রি: পাকিস্তানের বেসরকারীকরণ নীতির বড় পরীক্ষা

পাকিস্তানি আন্তর্জাতিক বিমান

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস (পিআইএ)-এর সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে দেশটির দীর্ঘদিনের আলোচিত বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হলো। ৪৮ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের দর দিয়ে একটি পাকিস্তানি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এই নিলামে বিজয়ী হয়েছে। আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের যে অঙ্গীকার পাকিস্তান সরকার করে আসছে, এই চুক্তিকে তার বাস্তব পরীক্ষার মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দীর্ঘ সময় ধরে লোকসান, অতিরিক্ত জনবল, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগে সমালোচিত পিআইএ বর্তমানে তীব্র নগদ সংকটে রয়েছে। নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা, বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মীদের বেতন পরিশোধ—সবকিছুই হয়ে উঠেছিল কঠিন। এমন এক প্রেক্ষাপটে সংস্থাটির শেয়ার বিক্রি সম্পন্ন হলো, যখন পাকিস্তান সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট ও বৈদেশিক লেনদেন ঘাটতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এই নিলামে তিনটি পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল দৃশ্যমান ও আনুষ্ঠানিক। একাধিক দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা স্বচ্ছ বাক্সে তাদের আর্থিক প্রস্তাব জমা দেন। নিলামের শেষে পিআইএ’র ৭৫ শতাংশ শেয়ারের জন্য ১৩৫ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি দর দিয়ে শীর্ষে উঠে আসে আরিফ হাবিব ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, আগামী মাসগুলোতে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ শেয়ার কেনার সুযোগও পাবে প্রতিষ্ঠানটি।

নিলাম শুরুর আগে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, এই বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার ভাষায়, এটি কেবল একটি কোম্পানি বিক্রির বিষয় নয়, বরং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সরকার চায়, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা যাক—পাকিস্তান কঠিন হলেও প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত।

এই নিলামে আরিফ হাবিব ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ ছাড়াও প্রতিযোগিতায় ছিল লাকি সিমেন্টের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম, যারা ১৩৪ বিলিয়ন রুপির দর দেয়। অন্যদিকে বেসরকারি বিমান সংস্থা এয়ার ব্লু দেয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম, মাত্র ২৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন রুপির প্রস্তাব। দরপত্রগুলোর ব্যবধানই দেখিয়ে দেয়, পিআইএ’র ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের মূল্যায়নে কতটা পার্থক্য ছিল।

এর আগে গত বছর পিআইএ বেসরকারীকরণের একটি উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। সে সময় মাত্র একটি দরপত্র পাওয়া গিয়েছিল, যার মূল্য ছিল প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার—যা সরকারের প্রত্যাশিত ৩০০ থেকে ৩০৫ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক কম। সেই ব্যর্থতা সরকারের জন্য বড় ধাক্কা ছিল এবং বেসরকারীকরণ নীতি নিয়ে প্রশ্নও উঠেছিল। এবারের নিলামে তুলনামূলকভাবে বেশি দর পাওয়া যাওয়ায় সরকার কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে।

আর্থিক চিত্রের দিকে তাকালে পিআইএ’র সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়। পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তালিকাচ্যুত হওয়ার আগে, ২০২২ অর্থবছরে সংস্থাটি প্রায় ৮৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করলেও নিট লোকসান ছিল প্রায় ৪৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ধারাবাহিক এই লোকসান পিআইএ’কে কার্যত রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে।পাকিস্তানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মালিকানায় পিআইএ কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা নির্ভর করবে ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং পেশাদার পরিচালনার ওপর। একই সঙ্গে কর্মী ছাঁটাই, রুট পুনর্বিন্যাস এবং বহর আধুনিকায়নের মতো কঠিন সিদ্ধান্তও আসতে পারে। ফলে এই বিক্রয় শুধু একটি আর্থিক লেনদেন নয়, বরং পাকিস্তানের রাষ্ট্রায়ত্ত খাত সংস্কারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার প্রতীক হয়ে থাকল।

Read Previous

স্কাইস্পিয়ার ডিজিটাল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫: অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ক্যাটাগরিতে শেয়ারট্রিপের স্বীকৃতি

Read Next

ময়মনসিংহের ময়না দ্বীপ: ব্রহ্মপুত্র বুকে লুকিয়ে থাকা নীরব সৌন্দর্যের ঠিকানা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular