স্যাটেলাইট সংযোগ বিচ্ছিন্ন: ব্যাকআপ ব্যবস্থায় চলছে এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশন, বাড়ছে ঝুঁকির শঙ্কা

শাহজালাল বিমানবন্দর কন্ট্রোলরুম

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)-এর এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশন সিস্টেম বর্তমানে স্যাটেলাইট সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। এই সিস্টেমের মাধ্যমেই দেশের সব বিমানবন্দরের বিমান উড্ডয়ন, অবতরণ ও সার্বিক অপারেশন পরিচালিত হয়। আপাতত ফাইবার অপটিক্যাল কেবলের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে কার্যক্রম চালু রাখা হলেও, এটি দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।

এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশন সিস্টেম বিমান চলাচলের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর একটি। পাইলটদের সঙ্গে কন্ট্রোল টাওয়ারের যোগাযোগ, ফ্লাইটের রুট নির্দেশনা, আবহাওয়ার আপডেট—সবকিছুই এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সাধারণত স্যাটেলাইট সংযোগকে মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং ফাইবার অপটিক্যাল কেবল থাকে ব্যাকআপ হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে সেই সমীকরণ পুরোপুরি উল্টো হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট সংযোগ বন্ধ থাকায় ব্যাকআপ ব্যবস্থাকেই প্রধান ভরসা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি পরিস্থিতি। কারণ ফাইবার অপটিক্যাল কেবলে যেকোনো সময় যান্ত্রিক ত্রুটি, নির্মাণকাজজনিত ক্ষতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব পড়তে পারে। অতীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফাইবার কেবল কেটে যাওয়ার ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। এমন কোনো ঘটনা যদি এখন ঘটে, তাহলে দেশের বিমানবন্দরগুলোর অপারেশন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। চরম পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ করার মতো অবস্থাও তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশ্ন এখন আর “ব্যাকআপ দিয়ে চলছে” পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন হলো—এই ব্যাকআপ দিয়ে আর কতদিন নিরাপদভাবে পরিচালনা সম্ভব? এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থায় ‘রিডানডেন্সি’ বা একাধিক বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। সেখানে যদি মূল সংযোগ দীর্ঘদিন অচল থাকে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাই তারা দ্রুত স্যাটেলাইট সংযোগ পুনরায় চালু করা এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে বেবিচকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমানে অপারেশনাল কোনো সংকট নেই। বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট—এটিএম) এয়ার কমোডর নূর ই আলম জানান, বাংলাদেশ স্যাটেলাইটে জ্যামিংয়ের কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে এখনো সমস্যার সুনির্দিষ্ট উৎস চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, এটি মূলত বাংলাদেশ স্যাটেলাইট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয় এবং তারাই এর সমাধান করবে। বেবিচকের পক্ষ থেকে বিমান চলাচল স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

এই পরিস্থিতির পেছনের প্রযুক্তিগত দিকটি ব্যাখ্যা করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি বাংলাদেশের এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশনে ব্যবহৃত স্যাটেলাইট সংযোগে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে নির্ধারিত স্পেকট্রামে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিটিআরসি সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক সরকারি স্মারকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।

বিটিআরসির স্পেকট্রাম মনিটরিং শাখার তথ্যমতে, ক্যাবের এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশনের জন্য স্থাপিত ভিস্যাট সিস্টেমে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) বিএস-১ স্যাটেলাইটের জন্য বরাদ্দকৃত ৪৫৪০ থেকে ৪৫৪৬ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডে অপ্রত্যাশিত সিগন্যাল শনাক্ত করা হয়। এসব সিগন্যালের কারণে ইন্টারফিয়ারেন্স বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়, যা স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত করে।

এই তথ্য পাওয়ার পর বিটিআরসি এবং বিএসসিএল যৌথভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে। গত ২০ অক্টোবর একটি যৌথ তরঙ্গ পরিবীক্ষণ দল মাঠপর্যায়ে স্পেকট্রাম মনিটরিং চালায়। স্পেকট্রাম অ্যানালাইজারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে খুব স্বল্প সময়ের জন্য দুটি আলাদা ফ্রিকোয়েন্সির পিক শনাক্ত করা হয়। তবে সেগুলোর উপস্থিতি এতটাই ক্ষণস্থায়ী ছিল যে সেগুলোকে স্থিতিশীল সিগন্যাল হিসেবে বিবেচনা করা যায়নি।

ফলে ওই অপ্রত্যাশিত সিগন্যালগুলোর প্রকৃত উৎস নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। বিটিআরসি জানিয়েছে, নির্দিষ্ট উৎস চিহ্নিত না হওয়ায় সমস্যার কারণও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এই অনিশ্চয়তাই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই প্রেক্ষাপটে বিটিআরসি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, ক্যাব কর্তৃক ব্যবহৃত বর্তমান ভিস্যাট সিস্টেমের ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড পরিবর্তন করে ভিন্ন একটি ব্যান্ড বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ইন্টারফিয়ারেন্সের ঝুঁকি কমবে এবং এয়ার ট্রাফিক কমিউনিকেশন আরও নির্ভরযোগ্য হবে।

এই সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে গত ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে একটি আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেবিচকের চেয়ারম্যান, বিএসসিএল-এর সংশ্লিষ্ট মহাব্যবস্থাপক এবং বিটিআরসি চেয়ারম্যানের দপ্তরকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ঝুঁকিমুক্ত নয়—এটাই বাস্তবতা। এভিয়েশন খাতে সামান্য যোগাযোগ বিভ্রাটও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অস্থায়ী সমাধানে সন্তুষ্ট না থেকে দ্রুত স্থায়ী ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সময়ের দাবি। দেশের আকাশপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্যাটেলাইট সংযোগ পুনরুদ্ধার এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার শক্ত ভিত গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

Read Previous

শিমান্তো ব্যাংক ও নভোএয়ারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক, কার্ডধারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা

Read Next

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধন নয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular