
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : খুলনার দাকোপ উপজেলার সুন্দরবন–সংলগ্ন সুতারখালী ইউনিয়নের গুনারী এলাকায় নতুন করে বাঘ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, রোববার সন্ধ্যায় গুনারী গ্রামের বৈদ্যপাড়া এলাকায় একটি বাঘ দেখা গেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই পুরো এলাকায় ভীতি ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। সন্ধ্যা নামলেই মানুষ ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিচ্ছে, অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরেই গ্রামের আশপাশে ধানখেত ও কাঁচা রাস্তার পাশে বড় প্রাণীর পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছিল। শুরুতে বিষয়টিকে কেউ নিশ্চিতভাবে বাঘের উপস্থিতি বলে মনে করেনি। তবে রোববার সন্ধ্যায় একজন গ্রামবাসী সরাসরি বাঘ দেখার দাবি করার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মুরারী হালদার জানান, কয়েক দিন ধরে এলাকায় বাঘের পায়ের ছাপ দেখা যাওয়ার কথা শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু কেউ চোখে দেখেনি বলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। রোববার সন্ধ্যায় পুলিন বৈদ্য নামের এক ব্যক্তি বাঘ দেখেছেন বলে জানানোর পর এলাকাবাসীর মধ্যে ভীতি আরও বেড়ে যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক পরিবার শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
দক্ষিণ গুনারী উপেননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক অনিমেশ মণ্ডল বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। কোথাও কোথাও বাঘের পায়ের মতো ছাপ দেখা গেলেও সরাসরি দেখা যায়নি। তবে বাঘ দেখার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গ্রামের মানুষ দলবদ্ধভাবে ধানখেতে খোঁজাখুঁজি করেন। পাকা ধানের কারণে ভেতরে ভালোভাবে তল্লাশি করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাঘের কোনো সন্ধান না পেয়ে সবাই বাড়ি ফিরে যান।
যিনি বাঘ দেখার দাবি করেছেন, সেই পুলিন বৈদ্য জানান, সন্ধ্যার পর খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ সামনে একটি বাঘ দেখতে পান। টর্চের আলো পড়তেই প্রাণীটি দ্রুত পাশের ধানখেতে ঢুকে পড়ে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাঘটি আকারে তুলনামূলক ছোট ছিল, সম্ভবত শাবকও হতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিনি সুন্দরবন এলাকার মানুষ এবং বাঘ ও বাঘডাশার পার্থক্য বোঝেন। তাঁর দেখা প্রাণীটি কোনোভাবেই বাঘডাশা ছিল না।
এদিকে এলাকাবাসীর উদ্বেগ বাড়লেও বন বিভাগ এখনো বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বাঘের উপস্থিতি হিসেবে দেখছে না। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, কয়েক দিন আগে ওই এলাকায় বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়ার খবর পাওয়া গেলেও তল্লাশিতে কিছু পাওয়া যায়নি। রোববার সন্ধ্যায় আবার বাঘ দেখার খবর এসেছে। তবে গত সাত দিনে গবাদিপশু বা অন্য কোনো প্রাণীর ওপর হামলার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণে বন বিভাগের প্রাথমিক ধারণা, এটি মেছোবিড়াল বা বাঘডাশা হতে পারে।
তিনি আরও জানান, সোমবার সকালে বন বিভাগের একটি দল ওই এলাকায় যাবে। সেখানে যদি কোনো বন্য প্রাণীর উপস্থিতির আলামত পাওয়া যায়, তাহলে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি প্রাণীটি লোকালয়ে চলে এসে থাকে, তাহলে সেটিকে উদ্ধার করে নিরাপদভাবে বনে অবমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সুন্দরবনসংলগ্ন এই জনপদগুলোতে এর আগেও বাঘ আতঙ্কের ঘটনা ঘটেছে। অনেক সময় লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘ নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নতুন করে বাঘ দেখার খবর ছড়ানো মাত্রই মানুষের মনে পুরোনো ভয় ফিরে এসেছে। স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত বন বিভাগের তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। রাতের বেলা পাহারা, মাইকিং এবং সচেতনতা কার্যক্রম চালানো না হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়।
এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, গুনারী এলাকায় দেখা প্রাণীটি সত্যিই বাঘ নাকি অন্য কোনো বন্য প্রাণী। তবে অনিশ্চয়তাই এখন বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। বন বিভাগের তল্লাশির ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো এলাকা। গ্রামবাসীর একটাই চাওয়া—ভয় দূর হোক, আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক সুন্দরবনঘেঁষা এই জনপদ।



