পদ্মার তীরে নতুন প্রাণ: রাজবাড়ীর গোদারবাজারে গড়ে উঠছে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র

পদ্মা পাড

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : পদ্মা নদীকে ঘিরেই রাজবাড়ীর পরিচয়, ইতিহাস আর মানুষের আবেগ। সেই পদ্মার তীরেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে গোদারবাজার এলাকা। সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের এই নদীপাড় এখন আর শুধু একটি নিরিবিলি স্থান নয়, ধীরে ধীরে এটি রূপ নিচ্ছে একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে। প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। কেউ আসছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ আবার একা এসে নদীর হিমেল বাতাসে কিছুটা সময় কাটাচ্ছেন।

একসময় গোদারবাজার ছিল রাজবাড়ীর মানুষের কাছে পরিচিত একটি ঘোরার জায়গা। তখন নদীর পাড়ে কিছু সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ হয়েছিল, বসার ব্যবস্থা ছিল, সন্ধ্যায় মানুষের ভিড়ও দেখা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পদ্মার ভাঙনে সেসব স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। দীর্ঘদিন কোনো সংস্কার বা নতুন উদ্যোগ না থাকায় এলাকাটি ধীরে ধীরে তার আগের আকর্ষণ হারাতে থাকে। দর্শনার্থী কমে যায়, এলাকাটি পড়ে থাকে অবহেলায়।

এই অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয় রাজবাড়ীতে নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে ফারহানা ইয়াসমিন দায়িত্ব নেওয়ার পর। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি শহরের আশপাশের সম্ভাবনাময় স্থানগুলো ঘুরে দেখেন এবং পদ্মা নদীর তীরকে ঘিরে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তার উদ্যোগেই গোদারবাজার এলাকায় আবারও শুরু হয় সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ। লক্ষ্য ছিল, পদ্মাপারকে এমনভাবে সাজানো, যাতে মানুষ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারে।

নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমেই দর্শনার্থীদের বসার জন্য নির্মাণ করা হয় দৃষ্টিনন্দন বেঞ্চ ও গোলঘর। নারী ও শিশুদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে স্থাপন করা হয় আধুনিক ওয়াশব্লক। পরিবেশকে আরও সবুজ করতে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ করা হয়। পাশাপাশি এলাকাটিকে আলাদা পরিচিতি দিতে নদীর তীরে স্থাপন করা হয় ‘আই লাভ রাজবাড়ী’ লেখা সাইনবোর্ড, যা অল্প সময়েই দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় সংযোজন হিসেবে তৈরি করা হয় ‘নীরব ছোঁয়া’ নামের একটি স্থাপনা। এই স্থাপনাটি নদীর খুব কাছে হওয়ায় এখানে বসে পদ্মার বিস্তৃত জলরাশি আর সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা আলোকিত রাখতে বসানো হয়েছে সোলার লাইট, যা নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য দুটোই নিশ্চিত করেছে।

শুক্রবার বিকেলে গোদারবাজার পদ্মাপারে গিয়ে দেখা যায়, মানুষের উপচে পড়া ভিড়। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে মানুষ ছুটে এসেছেন এখানে। শিশু-কিশোরদের কোলাহলে মুখর পুরো এলাকা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ নাগরদোলায় চড়ছেন, আবার কেউ নদীর ধারে বসে গল্পে মেতে উঠেছেন। নদীর পাড়জুড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী খাবারের দোকান। ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, আইসক্রিমের পাশাপাশি রয়েছে খেলনা ও ছোটখাটো পণ্যের দোকান।

দর্শনার্থীদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। শিশুদের আকর্ষণের জন্য আছে নাগরদোলা ও বিভিন্ন রাইড। ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় নদীতে ঘোরার সুযোগও রয়েছে, যা তরুণদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

পদ্মাপারে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী রাকিবুল হাসান বলেন, অনেক দিন পর গোদারবাজারে এসে সত্যিই ভালো লাগছে। আগে জায়গাটা বেশ নির্জন ছিল, এখন এখানে বসার ব্যবস্থা আছে, আলো আছে, ছবি তোলার সুন্দর জায়গা আছে। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি দারুণ।

আরেক দর্শনার্থী নাজমা খাতুন জানান, ‘নীরব ছোঁয়া’ স্থাপনাটি তার খুব ভালো লেগেছে। তিনি বলেন, এটি শুধু বসার জায়গা নয়, এখানে বসে প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের সংযোগ অনুভব করা যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, গোদারবাজার এলাকায় এমন একটি নান্দনিক বিনোদনকেন্দ্রের প্রয়োজন অনেকদিনের ছিল। নতুন করে জায়গাটি সাজানোর ফলে মানুষের ভিড় বেড়েছে, পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসারও উন্নতি হচ্ছে।

ফুচকা বিক্রেতা আল আমিন জানান, আগে এখানে বেচাকেনা খুব একটা হতো না। এখন প্রতিদিনই ভালো বিক্রি হচ্ছে। তবে তিনি মনে করেন, সারা বছর দর্শনার্থী ধরে রাখতে হলে আরও কিছু স্থায়ী আয়োজন প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, রাজবাড়ীকে একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বসবাসযোগ্য জেলা হিসেবে গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য। পদ্মা নদীর তীরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে যে কাজগুলো করা হচ্ছে, গোদারবাজার তার একটি অংশমাত্র। ভবিষ্যতে এখানকার অবকাঠামো আরও উন্নত করা হবে, যাতে এটি একটি টেকসই পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়।

সব মিলিয়ে গোদারবাজারের পদ্মাপার এখন রাজবাড়ীর মানুষের জন্য নতুন করে আশার জায়গা। পদ্মার ঢেউ, খোলা আকাশ আর মানুষের কোলাহলে এই পর্যটনকেন্দ্র ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে জেলার বিনোদনের নতুন ঠিকানা।

প্রতিবেদক : আহাদ হোসেন খান

Read Previous

রোমান পেন্থিয়ন: দেবতা, ইতিহাস আর স্থাপত্যের জীবন্ত বিস্ময়

Read Next

সুন্দরবনঘেঁষা দাকোপে বাঘ আতঙ্ক, গ্রামবাসীর রাত কাটছে উৎকণ্ঠায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular