
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ :
সিলেট বিভাগের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম প্রতীক হলো গোয়াইনঘাট উপজেলা। এখানকার সবুজ পাহাড়, চা-বাগান, স্বচ্ছ নদী, ঝর্ণা এবং পাথরের সমাহার যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত ক্যানভাস। বছরজুড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষেরা এখানে ছুটে আসেন শান্তি ও সৌন্দর্যের সন্ধানে। বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিতে এ অঞ্চলের পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটকের ঢল নামে। জাফলং, বিছনাকান্দি, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, পান্তুমাই ঝর্ণা, লালাখালসহ বিভিন্ন স্থান এবারও পর্যটকদের অপেক্ষায় রয়েছে।
গোয়াইনঘাটের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্পট জাফলং। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডাউকি শহরের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত এ স্থানে পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নুড়ি-পাথর, উঁচু টিলা এবং দূরের পাহাড়চূড়ায় মেঘের খেলা দেখে মন ভরে যায়। জাফলং জিরো পয়েন্টে দাঁড়ালে সামনেই দেখা যায় ডাউকি ব্রিজ এবং ওপারের ভারতীয় পাহাড়ি দৃশ্য। নৌকায় করে খাসিয়া পল্লী, চা-বাগান ঘুরে বেড়ানোর সুযোগও রয়েছে এখানে। পরিবার-পরিজন বা বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলা এবং প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ। কাছাকাছি মায়াবী ঝর্ণা, খাসিয়া গ্রাম এবং চা-বাগানও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
আরেকটি অসাধারণ স্পট বিছনাকান্দি। এখানে পাহাড়ি ঝর্ণা ও স্বচ্ছ জলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরূপ। পান্তুমাই ঝর্ণাও গোয়াইনঘাটের একটি লুকানো রত্ন, যেখানে পাহাড় বেয়ে নেমে আসা জলধারা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। জৈন্তাপুরের লালাখালে নীলাভ স্বচ্ছ জলের হ্রদ এবং চারপাশের সারিবদ্ধ চা-বাগান এক অনন্য দৃশ্য সৃষ্টি করে। রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, যা ‘সিলেটের আমাজন’ নামে পরিচিত, নৌকায় করে ঘুরে দেখার জন্য অসাধারণ। গহিন জলাভূমি, গাছের ডালপালা আর শান্ত পরিবেশ এখানে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়।
এসব স্পটের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সিলেট শহর থেকে যাতায়াত খুবই সহজ। কদমতলী বাসস্ট্যান্ড বা সোবহানীঘাট থেকে সরাসরি বাসে জাফলং যাওয়া যায়, যাতে জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ১৫০ টাকা। সিএনজি, লেগুনা বা মাইক্রোবাসেও যাতায়াত সম্ভব। সিলেট থেকে গোয়াইনঘাটের দূরত্ব প্রায় ৫০-৬০ কিলোমিটার, যা ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়। স্থানীয়ভাবে নৌকা ভাড়া করে বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখা যায়।
থাকার ব্যবস্থাও বেশ উন্নত। সিলেট শহরে অসংখ্য হোটেল-রিসোর্টের পাশাপাশি জাফলং ও গোয়াইনঘাট এলাকায় রিসোর্ট, গেস্ট হাউস এবং স্বল্প বাজেটের আবাসন রয়েছে। স্থানীয় খাবারের মধ্যে হাওর-বাওরের তাজা মাছ, দেশী মুরগি, গরুর মাংসের বিভিন্ন পদ এবং সিলেটি খাবার পর্যটকদের মন জয় করে।
ঈদুল ফিতরের এই দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। গোয়াইনঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান জানান, জাফলংসহ সকল পর্যটন স্পটে ফুট প্যাট্রোল, পেট্রোল টিম, ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। পর্যটকরা যাতে কোনো ভোগান্তি ছাড়াই প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি পর্যটকদের নিরাপদ ও আনন্দময় ভ্রমণের আহ্বান জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিলেটের পর্যটন খাত দ্রুত বিকশিত হয়েছে। হোটেল-রিসোর্টের বুকিং আগেভাগেই প্রায় শেষ হয়ে যায়। তবে প্রকৃতির সঙ্গে সুর মিলিয়ে ভ্রমণ করতে হলে আবহাওয়ার দিকে নজর রাখা জরুরি। বর্ষাকালে ঝর্ণা ও নদীর জল আরও উচ্ছল হয়, শীতে পাহাড়-টিলা আরও স্পষ্ট দেখা যায়।
গোয়াইনঘাটের এসব পর্যটনকেন্দ্র শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়, মনকে শান্তি ও নতুন করে জীবনের সৌন্দর্য উপলব্ধি করায়। নগরজীবনের কোলাহল থেকে মুক্তি চাইলে এখানে আসুন, প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যান। ঈদের এই ছুটিতে সিলেট-গোয়াইনঘাটের প্রাকৃতিক রূপ উপভোগ করে নতুন স্মৃতি গড়ে তুলুন।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার



