
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা এখন ফুলের রঙিন সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে মাঠজুড়ে হাসছে গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা এবং রজনীগন্ধা—যেন এক বিশাল প্রাকৃতিক ছবির ফ্রেম। বসন্তবরণ, ভালোবাসা দিবস এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে এখানকার ফুলের বাগানগুলোতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। পর্যটকদের জন্য এটি এক নতুন গন্তব্যস্থল হিসেবে উঠে আসছে, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের সাথে স্থানীয় কৃষি সংস্কৃতির মিলন ঘটছে। ‘পর্যটন সংবাদ’ এর প্রতিবেদকের চোখে এই অঞ্চলটি শুধু ফুল চাষের কেন্দ্র নয়, বরং একটি জীবন্ত পর্যটন হাব যা ঢাকা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত।
সিংগাইরের তালেবপুর, ধল্যা, জয়মন্টপ, শায়েস্তা এবং জামির্ত্তা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা এখন ‘ফুলপল্লী’ নামে খ্যাত। ইরতা, নতুন ইরতা, ফোর্ডনগর, ভাকুম, নীলটেক এবং পানিশাইলের মতো গ্রামগুলোতে মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফুটেছে নানা রঙের ফুল। সকালে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে কুয়াশার চাদর সরে গেলে দৃশ্যটা যেন একটি জীবন্ত পেইন্টিং। পর্যটকরা এখানে এসে ফুলের মাঠে হাঁটাহাঁটি করতে পারেন, ছবি তুলতে পারেন এবং স্থানীয় চাষিদের সাথে কথা বলে তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে পারেন। এই অঞ্চলটি ঢাকা থেকে সড়কপথে সহজেই পৌঁছানো যায়—মানিকগঞ্জ হয়ে সিংগাইর বাজার পেরিয়ে এই গ্রামগুলোতে যাওয়া যায়। স্থানীয় বাস বা প্রাইভেট গাড়িতে ভ্রমণ করে পর্যটকরা এখানে দিনভর সময় কাটাতে পারেন, বিশেষ করে বসন্তের এই মৌসুমে যখন ফুলের সৌন্দর্য চরমে।
ফুলচাষিরা জানান, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এই উৎসবের মাসগুলোতে ফুলের চাহিদা বেড়ে যায়। বসন্তবরণে ফুলের মালা, ভালোবাসা দিবসে গোলাপের তোড়া এবং ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল অর্পণ—এসবের জন্য ফুলের বাজার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চাষিরা জমি প্রস্তুতি থেকে শুরু করে সেচ, সার প্রয়োগ এবং ফুলগাছের পরিচর্যায় বাড়তি শ্রম দেন। ধল্যা ইউনিয়নের ফোর্ডনগরের পাইকারি ব্যবসায়ী মো. সোহেল রানা বলেন, “ঢাকা, গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে আগাম অর্ডার আসছে। এই সময় ফুলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।” পর্যটকদের জন্য এটি একটি সুযোগ—তারা সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে ফুল কিনে নিতে পারেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে। এছাড়া, ফুলের মাঠগুলোতে ছোট ছোট ক্যাফে বা বিশ্রামস্থল গড়ে উঠছে, যেখানে পর্যটকরা চা-কফি খেয়ে বিশ্রাম নিতে পারেন।
সিংগাইর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুসারে, চলতি মৌসুমে ৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক ফুল চাষ হয়েছে। এর মধ্যে গোলাপ, জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা, গ্লাডিওলাস, জিপসি, স্টার ফুল, রজনীগন্ধা এবং গাঁদা প্রধান। এই ফুলগুলোর বড় অংশ ঢাকার বাজারে যায়, কিন্তু স্থানীয়ভাবে পর্যটকদের জন্যও সরবরাহ বাড়ছে। শহরের শহীদ রফিক সড়কের ফুল বিক্রেতা আজহার আলী জানান, “আশপাশের এলাকা থেকে ফুল আসে, কিন্তু সিংগাইরের ফুলের গুণগত মান সবচেয়ে ভালো।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, “ফুল চাষ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এটি শুধু অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, পর্যটনের জন্যও সম্ভাবনাময়।” পর্যটনের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ফুলের মাঠগুলোকে ‘ফ্লাওয়ার ট্যুরিজম’ হিসেবে প্রচার করা যায়। ইউরোপের টিউলিপ গার্ডেন বা ভারতের কাশ্মীরের ফুলের উপত্যকার মতো, সিংগাইরও একটি ছোট আকারের ফুলের স্বর্গ হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন যদি পথনির্দেশক বোর্ড, নিরাপত্তা এবং গাইডের ব্যবস্থা করে, তাহলে পর্যটক সংখ্যা বাড়বে।
উৎসবের দিনগুলো যত ঘনিয়ে আসছে, ফুলের দামও বাড়ছে। বর্তমানে প্রতিটি দেশি গোলাপ ৩০-৪০ টাকা, জারবেরা ৪০-৫০ টাকা, গ্লাডিওলাস ২০-৩০ টাকা এবং রজনীগন্ধা ১০-১৫ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, তিন দিবসে গড়ে ৮০-৯০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হবে, যা মোট কোটি টাকার বেশি। এই অর্থনৈতিক প্রবাহ পর্যটনকে আরও চাঙ্গা করবে। পর্যটকরা এখানে এসে ফুলের বাজার দেখতে পারেন, যা একটি জীবন্ত বাজার অভিজ্ঞতা। সকালে ফুল তোলার দৃশ্য, চাষিদের ব্যস্ততা—এসব দেখে পর্যটকরা গ্রামীণ জীবনের স্বাদ পাবেন। এছাড়া, স্থানীয় খাবার যেমন পিঠা-পায়েস বা তাজা ফলের সাথে ফুলের মাঠ ভ্রমণকে যুক্ত করলে এটি একটি সম্পূর্ণ পর্যটন প্যাকেজ হয়ে উঠবে।
তবে চাষিদের মধ্যে উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে। সার, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমছে। ধল্লা ইউনিয়নের ফোর্ডনগরের চাষি আব্দুল মজিদ মিয়া বলেন, “এ মৌসুমে ১৫ বিঘা জমিতে চায়না গোলাপসহ বিভিন্ন ফুল চাষ করেছি। সাধারণত মাসে ৪-৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করে ৮০-৯০ হাজার লাভ থাকে। কিন্তু এবার ছত্রাকের আক্রমণ এবং কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির কারণে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।” একই এলাকার মো. সিরাজ মিয়া যোগ করেন, “ফুলের রঙ এবং আকার ভালো হয়েছে, কিন্তু খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ কমবে।” পাইকারি ব্যবসায়ী সোহেল রানা বলেন, “পরিবহন এবং শ্রম খরচ বাড়ায় ব্যবসার চাপ বাড়ছে। তবে সঠিক সময়ে বাজারে পৌঁছাতে পারলে লাভ সম্ভব।” এই চ্যালেঞ্জগুলো পর্যটনের মাধ্যমে মোকাবিলা করা যায়—যদি পর্যটকরা সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে কিনেন, তাহলে মধ্যস্থতাকারীদের কমিশন কমবে এবং চাষিরা বেশি লাভবান হবেন।
কৃষি কর্মকর্তা হাবিবুল বাশার চৌধুরী পরামর্শ দেন, “আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক সার প্রয়োগ এবং শ্রম সাশ্রয়ী পদ্ধতি গ্রহণ করলে খরচ নিয়ন্ত্রণে আসবে। বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ালে কৃষকরা লাভবান হবেন।” পর্যটনের প্রসারের জন্য সরকারি উদ্যোগ দরকার—যেমন ফুলের মাঠগুলোকে ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে প্রচার, হোমস্টে ব্যবস্থা এবং ফেস্টিভাল আয়োজন। বসন্তের এই মৌসুমে সিংগাইর ভ্রমণ করলে পর্যটকরা শুধু ফুলের সৌন্দর্যই উপভোগ করবেন না, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির সাথে যুক্ত হবেন। এটি একটি ইকো-ফ্রেন্ডলি পর্যটন মডেল, যা পরিবেশ সংরক্ষণের সাথে যুক্ত।
সিংগাইরের ফুলের মাঠগুলো বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে এক নতুন সংযোজন। ঢাকার কোলাহল থেকে দূরে এই শান্ত গ্রামীণ এলাকায় এসে পর্যটকরা মনের শান্তি খুঁজে পাবেন। ফুলের সুবাস, রঙের ছড়াছড়ি এবং চাষিদের আতিথেয়তা—এসব মিলিয়ে এটি এক অমূল্য অভিজ্ঞতা। যদি আপনি বসন্তের উৎসবে অংশ নিতে চান বা প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে চান, তাহলে সিংগাইরের দিকে যাত্রা করুন। এখানকার ফুলপল্লী শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।



