রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে: বহু যাত্রী নিখোঁজ, উদ্ধার অভিযান চলছে

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার ব্যস্ত দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঢাকাগামী ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৩ নম্বর পন্টুন থেকে সরাসরি পদ্মা নদীর গভীর জলে পড়ে যায়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় বাসে থাকা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন যাত্রীর মধ্যে অনেকেই এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুসারে, বাসটি ফেরিতে ওঠার প্রস্তুতিতে ছিল। হঠাৎ করে চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে বাসটি পন্টুনের প্রান্ত থেকে ছিটকে নদীতে পড়ে। পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসটি দ্রুত ডুবে যেতে শুরু করে। কয়েকজন যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও অধিকাংশই বাসের ভিতরে আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বাসটিতে কুষ্টিয়ার কুমারখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা যাত্রীরা ছিলেন। অনেকেই পরিবার নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পাটুরিয়া ও আরিচা ঘাট থেকে অতিরিক্ত ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ও ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছালেও প্রাথমিক পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করতে কিছুটা বিলম্ব হয়। নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনরা ঘাট এলাকায় ভিড় জমিয়ে আহাজারি করছেন। অনেকে উত্তেজিত হয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জেলা পুলিশ, নৌ পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা একযোগে কাজ করছেন।

রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, “বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। আমাদের ডুবুরি দল পুরোদমে উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।” জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, “উদ্ধারকারী ফেরি হামজা ঘটনাস্থলে সক্রিয় রয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে দ্রুত সবাইকে উদ্ধার করা যায়।”

ঘটনাস্থলে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত রয়েছেন। তাঁরা সরাসরি তদারকি করছেন। নদীর স্রোত তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় উদ্ধার কাজে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। ডুবুরিরা বাসটির অবস্থান শনাক্ত করে ভিতর থেকে যাত্রীদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

এ ধরনের দুর্ঘটনা দৌলতদিয়া ঘাটে এবারই প্রথম নয়। ফেরিঘাটের অবকাঠামো, পন্টুনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ উঠে আসছে। অনেকে মনে করছেন, পন্টুনের সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নিখোঁজ যাত্রীদের পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক স্বজন ঘাটে অপেক্ষা করে খবরের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছেন। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে আরও যাত্রীদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হবে। তবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার কাজে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে বহু হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশাসন সব ধরনের সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। দুর্ঘটনার পর ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। যাত্রীরা বিকল্প পথ খুঁজছেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনা পদ্মা নদীর ফেরিঘাটগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।

Read Previous

আবুধাবি-সিলেটগামী বিমান ফ্লাইটে যাত্রীদের তাণ্ডব: ক্রুদের কয়েক ঘণ্টা জিম্মি করে রাখার ঘটনা

Read Next

দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবি: পদ্মা নদীতে ১৮ জনের প্রাণহানি, উদ্ধার অভিযানে উঠলো ডুবে যাওয়া বাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular