দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবি: পদ্মা নদীতে ১৮ জনের প্রাণহানি, উদ্ধার অভিযানে উঠলো ডুবে যাওয়া বাস

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বুধবার বিকেলে একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীর গভীর জলে পড়ে যায়। ঘটনার ছয় ঘণ্টা পর বুধবার রাত সোয়া এগারোটার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র ক্রেনের সাহায্যে বাসের একাংশ দৃশ্যমান হয় এবং সাড়ে এগারোটায় পুরো বাসটি পানির ওপরে তুলে আনা হয়। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বাস থেকে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর আগে দুজনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। ফলে এ ঘটনায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে। উদ্ধারকৃত লাশের মধ্যে দুইজন শিশু, ১০ জন নারী ও চারজন পুরুষ রয়েছেন।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়া সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছে ফেরির জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। বাসটিতে শুরুতে মাত্র ছয়জন যাত্রী থাকলেও বিভিন্ন কাউন্টার থেকে যাত্রী ওঠানোর পর সংখ্যা বেড়ে কমপক্ষে ৫০ জনে পৌঁছায় বলে কাউন্টার মাস্টার জানিয়েছেন। পন্টুনে ওঠার সড়কে বাসটি দাঁড়িয়ে ছিল। ফেরি ঘাটে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ বাসটি চলতে শুরু করে এবং সরাসরি নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চালক যত চেষ্টাই করুন না কেন, গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার সাংবাদিকদের জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে ফোন করে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তিনি দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে সার্বক্ষণিক অবগত রাখতে বলেছেন। জেলা প্রশাসক আরও জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের কাজ চলছে। কমিটিতে জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি এবং পুলিশের প্রতিনিধিরা থাকবেন।

রাত ১২টা ৫০ মিনিটে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাফিজুর রহমান ১৪ জনের লাশ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেল থেকে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় ১৬ জনের লাশ উদ্ধারের খবর জানানো হয়। উদ্ধার অভিযানে জাহাজ ‘হামজা’র পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, নৌবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পদ্মা নদীর স্রোত এবং অন্ধকার রাত উদ্ধারকাজকে জটিল করে তুলেছিল। তবে সকাল থেকে চলমান অভিযানের ফলে রাতের মধ্যেই বাসটি উদ্ধার সম্ভব হয়।

দুর্ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী আবদুস সালাম জানান, তিনি ঢাকায় যাওয়ার জন্য ৩০০ টাকা ভাড়া দিয়ে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে উঠেছিলেন। ফেরি আসতে দেরি হওয়ায় বাস থেকে নেমে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘পন্টুনের সড়কে বাস দাঁড়ানো ছিল। ফেরি ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসটি হঠাৎ চলতে শুরু করে এবং সোজা নদীতে চলে যায়। চালক ব্রেক কষলেও কোনো লাভ হয়নি।’ আবদুস সালামের মতো অনেক যাত্রীই ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন, কিন্তু যারা বাসে ছিলেন তাদের অনেকের পরিবার এখন শোকে মুহ্যমান।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাট বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দর। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী ও যানবাহন এখান দিয়ে পদ্মা পাড়ি দেয়। ঘাটের পন্টুন ও সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছে। এবারের ঘটনায় ফেরিঘাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বাস চালকের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, ঘাট এলাকায় প্রায়ই যানজট ও অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এত বড় প্রাণহানির ঘটনা বিরল।

উদ্ধারকৃত লাশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য রাজবাড়ী মর্গে পাঠানো হয়েছে। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা ঘাট এলাকায় ভিড় করছেন। অনেকে এখনও তাদের স্বজনদের খোঁজ করছেন। প্রশাসন নিহতদের পরিবারকে সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। তদন্ত কমিটি দ্রুত রিপোর্ট জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় ঘাট এলাকায় যান চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং যাত্রীরা বিকল্প পথ খুঁজছেন।

এই দুর্ঘটনা শুধু ১৮টি প্রাণের ক্ষয় নয়, বরং সড়ক ও নৌপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এখন প্রশ্ন—আর কতবার এমন ঘটনা ঘটলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে? প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। দৌলতদিয়া ঘাটের এই মর্মান্তিক ঘটনা দেশজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে এবং নিরাপদ যাতায়াতের দাবিকে আরও জোরালো করেছে।

Read Previous

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে: বহু যাত্রী নিখোঁজ, উদ্ধার অভিযান চলছে

Read Next

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular