রাঙামাটিতে পাহাড় কাটায় হাইকোর্টের কঠোর অবস্থান

রাংঙামাটি

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : রাঙামাটির পাহাড়ি পরিবেশ ইতিমধ্যেই নাজুক। পর্যটনের জন্য পরিচিত এই জেলার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় নানা সময় উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে পাহাড় কাটার প্রবণতা থামেনি। এবার রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠায় হাইকোর্ট সরাসরি হস্তক্ষেপ করল।

আজ বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজি এবং বিচারপতি রাজিউদ্দিন আহমেদের দ্বৈত বেঞ্চ রাঙামাটি জেলায় পাহাড় কাটার ঘটনা নজরদারির জন্য একটি মনিটরিং কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে এই কমিটির কার্যক্রম ও গৃহীত পদক্ষেপের বিস্তারিত প্রতিবেদন আগামী তিন মাসের মধ্যে আদালতে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি হবে না, রুল জারি

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের সময় পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) রিট দায়ের করলে আদালত বিষয়টি আমলে নেয়। প্রথম আলোর ২৫ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করেই রিটটি করা হয়। শুনানি শেষে আদালত প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং কেন সেই নিষ্ক্রিয়তাকে বেআইনি ঘোষণা করা হবে না—সে বিষয়ে চার সপ্তাহের রুল জারি করেন।

রুলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে—
১) প্রশাসন পাহাড় কাটার ঘটনায় নিষ্ক্রিয় ছিল কেন
২) পাহাড় কাটা বন্ধে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না
৩) যে জায়গায় পাহাড় কাটা হয়েছে, তা মাটি ভরাট করে পুনর্বাসনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না

‘পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটা যাবে না’

শুনানিতে রিটকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি জানান, আইন অনুযায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কেউই পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটতে পারে না। অথচ রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে এবং সেটা প্রশাসনের সামনেই হয়েছে।

তিনি বলেন, “যে জেলায় পাহাড়ই প্রধান সম্পদ, সেখানে অনুমোদন ছাড়া পাহাড় কাটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রশাসন সামনে থেকেও ব্যবস্থা নেয়নি—এটাই সবচেয়ে হতাশাজনক।”

রিটে বিবাদী করা হয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিচালক, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, ওসিসহ রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে।

রাঙামাটির প্রকৃতি রক্ষায় গুরুত্ব

পর্যটনের দিক থেকে রাঙামাটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় জেলা। কাপ্তাই লেক, সবুজ পাহাড় আর শান্ত পরিবেশ মিলিয়ে প্রতি বছর লাখো পর্যটক এখানে ভিড় করেন। ফলে পাহাড় কাটা শুধু পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, পর্যটন খাতের জন্যও বড় হুমকি। পাহাড় ধসে মানুষের জীবনহানির ঝুঁকিও বাড়ে।

পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, যথাযথ নজরদারি ছাড়া পাহাড়ি জনপদে অবকাঠামো নির্মাণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আরও বেশি সচেতনতা প্রয়োজন।

আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন হলে কী বদলাবে

মনিটরিং কমিটি গঠনের নির্দেশের ফলে তিনটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে—

  • পাহাড় কাটার ঘটনা নিয়মিত নজরদারির আওতায় আসবে
  • অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে ঝুঁকি নিতে পারবে না
  • ইতিমধ্যেই যেসব জায়গায় ক্ষতি হয়েছে, সেগুলো পুনর্বাসনের সম্ভাবনা তৈরি হবে

রাঙামাটি শুধু একটি জেলা নয়, বাংলাদেশের পাহাড়ি সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র। সেই জায়গার পরিবেশ রক্ষায় আদালতের এই নির্দেশ স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশব্যাপী গুরুত্ব পাচ্ছে। রাঙামাটির পাহাড় বাঁচাতে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়—এখন তা সময়ই বলে দেবে।

Read Previous

শ্রীমঙ্গলের মির্জাপুরে লাল শাপলার বিস্ময়—নতুন পর্যটনকেন্দ্রে প্রতিদিন ভিড়

Read Next

স্মার্টফোন আমদানিতে শুল্ক কমছে: বৈধ বাজারে নতুন সুবিধা ও কঠোর নজরদারি আসছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular