মধ্যপ্রাচ্যে আকাশসীমা বন্ধের ধাক্কা: ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে ৪৪৮ ফ্লাইট চালু থাকলেও ৪৪৭টি বাতিল, প্রবাসীদের দুর্ভোগ চরমে

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (এইচএসআইএ) গত দুই সপ্তাহ ধরে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে ৪৪৮টি ফ্লাইট সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে, অন্যদিকে ঠিক একটি কম সংখ্যক ৪৪৭টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এই প্রায় সমান সংখ্যার তথ্য দেখে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে বিমান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এটি একটি গভীর কর্মক্ষম ও মানবিক সংকটকে আড়াল করেছে। মার্কিন-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের কারণে ৭টি দেশের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিক, বিমান সংস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উপর এর প্রভাব পড়ছে গুরুতরভাবে। সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ (সিএএবি) এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত এই সময়কালে এমন অসমতুল্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যা শুধু ফ্লাইট সংখ্যার হিসাব নয়, বরং যাত্রীদের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করছে।

এই সংকটের শুরু হয়েছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে, যখন ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার এবং জর্ডান তাদের আকাশসীমা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। ফলে ঢাকা থেকে ওই দেশগুলোর উদ্দেশ্যে নির্ধারিত ফ্লাইটগুলো একের পর এক বাতিল হয়ে যায়। প্রথম সপ্তাহেই বাতিলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে। বিশেষ করে ২ মার্চ একদিনেই ৪৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়। পরবর্তী দিনগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ২৪ থেকে ৪৬টি ফ্লাইট বন্ধ থাকায় মোট বাতিলের সংখ্যা ১১ মার্চ পর্যন্ত পৌঁছে ৩৯১-এ এবং শেষ পর্যন্ত ১৩ মার্চে ৪৪৭-এ দাঁড়ায়। এই বাতিলগুলোর মধ্যে বড় অংশ ছিল উপসাগরীয় বিমান সংস্থাগুলোর। কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস এবং এয়ার এরাবিয়ার মতো ক্যারিয়ারগুলো একেক দিনে ৪ থেকে ১০টি করে ফ্লাইট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। ফলে হাজার হাজার যাত্রী বিমানবন্দরে আটকে পড়েন এবং তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

অপরদিকে, যেসব দেশের আকাশসীমা খোলা ছিল, সেখানে ফ্লাইট পরিচালনা বেশ সফলভাবে চলেছে। মোট ৪৪৮টি ফ্লাইটের মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি ২১৯টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১১৮টি এবং ওমানে ১১১টি ফ্লাইট নিরাপদে চলাচল করেছে। ১২ মার্চ ছিল সবচেয়ে ব্যস্ত দিন, যেদিন ৪৮টি ফ্লাইট পরিচালিত হয়। এমনকি ১৩ মার্চেও ৩৭টি ফ্লাইটের পরিকল্পনা ছিল। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে সৌদি আরব ও ওমানের দ্রুত আকাশসীমা পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত।ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সসহ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে শারজাহ ও আবুধাবির রুট পুনরায় চালু করে এবং দুবাই, জেদ্দা ও রিয়াদে নিয়মিত সেবা বজায় রাখে। ফলে দৈনিক গড়ে ৩২টি ফ্লাইটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যোগাযোগ অটুট রাখা সম্ভব হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে খোলা রুটগুলোতে বিমান সংস্থাগুলোর সক্ষমতা যথেষ্ট ছিল এবং তারা প্রবাসী কর্মীদের চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়েছে।

তবে বন্ধ রুটগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিএএবির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য কোনো স্পষ্ট পুনরায় চালু করার সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। দুবাই ও আবুধাবির মতো প্রধান হাবগুলো অন্তত ১০ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ছিল এবং পরে বর্ধিত সময়সীমা জারি করা হয়। কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী যাত্রীরা অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। এসব গন্তব্যে ফ্লাইট মূলত সরাসরি হওয়ায় বিকল্প রুটের সুযোগ খুবই কম। ফলে বাতিলকরণ ছাড়া অন্য কোনো সমাধান ছিল না। এই অপর্যাপ্ত প্রশমন ব্যবস্থা যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়িয়ে তুলেছে।

এই দ্বৈত পরিস্থিতির সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে। লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতে আটকে পড়া কর্মীরা চাকরির নিরাপত্তা হারিয়ে ফেলছেন। অনেকে জরুরি ছুটিতে দেশে এসেছিলেন, কিন্তু ফিরে যেতে না পারায় তাদের বেতন কাটা যাচ্ছে এবং থাকার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বিমানবন্দরে আটকে থাকা শত শত যাত্রী দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন। এর ফলে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিমান সংস্থাগুলোরও বড় রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ ও কুয়েত এয়ারওয়েজের মতো কোম্পানিগুলো ঢাকা রুটে প্রতিদিন একাধিক ওয়াইড-বডি ফ্লাইট চালাত। দুই সপ্তাহের বন্ধে লক্ষ লক্ষ ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

এই সংকট প্রতিযোগিতার চেহারাও বদলে দিচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সতর্কতামূলকভাবে কিছু রুট স্থগিত করলেও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দ্রুত পুনরায় চালু করে বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। যদি আকাশসীমা আরও বন্ধ থাকে তাহলে সৌদি আরব, ওমান এবং তুর্কি বিমান সংস্থাগুলোর দিকে যাত্রীদের প্রবাহ স্থায়ীভাবে সরে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের বেসরকারি সেক্টরের লাভ হলেও সামগ্রিকভাবে প্রবাসীদের ভোগান্তি কমবে না।

যাত্রীদের অধিকারের প্রশ্নও উঠেছে। বাতিল ফ্লাইটের যাত্রীরা রুট পরিবর্তন বা টিকিটের টাকা ফেরত পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু ‘যুদ্ধের ঘটনা’ বা ‘অন্যান্য’ কারণের অজুহাতে বিমান সংস্থাগুলো প্রায়ই ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করে। ফলে যাত্রীরা শুধু ন্যূনতম সহায়তা পান এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ারের প্রতি আস্থা হারান। সিএএবি এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে আরও সক্রিয় হয়ে যাত্রীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক চাপে আকাশসীমা খুলে গেলেও এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এমন জরুরি পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

সার্বিকভাবে এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে বিমান শিল্প কতটা ভঙ্গুর। একদিকে খোলা রুটে সাফল্য, অন্যদিকে বন্ধ রুটে সম্পূর্ণ অচলাবস্থা। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য যারা দেশের রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস, তাদের জীবনযাত্রা ও জীবিকা এখন অনিশ্চয়তায়। সরকার, বিমান সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করে এই সংকটের দ্রুত সমাধান করতে হবে। অন্যথায় এই সংখ্যাগত সমতুল্যতা (৪৪৮ বনাম ৪৪৭) শুধু একটি পরিসংখ্যানই থেকে যাবে, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকবে হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ। এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো আঞ্চলিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা।

Read Previous

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর জন্য জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনা আজ পুনরায় শুরু হচ্ছে

Read Next

ফেনীর প্রতাপপুর জমিদারবাড়ি: ঐতিহ্যের মূল্যবান নিদর্শন থেকে পর্যটনের অপেক্ষমাণ স্বর্ণখনি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular