
ছবি : পর্যটন সংবাদ
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন এনেছে সরকার। বিদেশে কর্মী প্রেরণকারী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য নির্ধারিত নিরাপত্তা জামানতের অঙ্ক কমিয়ে আনা হয়েছে। এতদিন যেখানে লাইসেন্স পেতে ৫০ লাখ টাকা জমা দিতে হতো, সেখানে এখন থেকে তা ৩৫ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে আগের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম জামানতেই বিদেশে কর্মী পাঠানোর অনুমতি মিলবে।
এই পরিবর্তন এসেছে ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (রিক্রুটিং এজেন্ট লাইসেন্স এবং সাব-এজেন্ট নিবন্ধন ও আচরণ) বিধিমালা, ২০২৫’ সংশোধনের মাধ্যমে। সোমবার এ সংক্রান্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, এই সিদ্ধান্ত নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য রিক্রুটিং ব্যবসায় প্রবেশের বাধা কমাবে এবং বিদ্যমান এজেন্সিগুলোর ওপর দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপও হ্রাস করবে।
তবে নিরাপত্তা জামানতের পরিমাণ কমানো হলেও লাইসেন্স প্রক্রিয়ার মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বিদেশে কর্মী নিয়োগের লাইসেন্স পেতে আগের মতোই পে-অর্ডারের মাধ্যমে নির্ধারিত অর্থ জমা দিতে হবে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি বজায় রেখেই খাতটিকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করাই এই সংশোধনের লক্ষ্য।
সংশোধিত বিধিমালার আরেকটি বড় সংযোজন হলো ‘সহযোগী নিয়োগকারী’ নামে নতুন একটি ব্যবস্থার প্রবর্তন। নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, সহযোগী নিয়োগকারী হলেন এমন একজন নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্ট, যিনি অন্য কোনো নিবন্ধিত এজেন্টের সঙ্গে লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে বিদেশগামী কর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। অর্থাৎ প্রধান এজেন্টের পক্ষে কাজ করার একটি বৈধ ও স্বীকৃত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
নতুন বিধানের আওতায় রিক্রুটিং এজেন্টরা বিদেশে কর্মসংস্থান প্রক্রিয়াকরণের জন্য অন্যান্য নিবন্ধিত এজেন্টকে সহযোগী নিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত করতে পারবেন। তবে এই ব্যবস্থায় দায়িত্বের বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। সহযোগী নিয়োগকারীদের বিদেশে যাওয়া কর্মীদের সঙ্গে চুক্তি বজায় রাখতে হবে এবং কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে প্রধান এজেন্টদের মতোই আর্থিক ও আইনগত দায় বহন করতে হবে। ফলে কোনো অনিয়ম হলে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না।
লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম যুক্ত হয়েছে। সহযোগী নিয়োগকারীদের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকৃত কর্মীদের সংখ্যা তাদের নিজস্ব ক্রেডিট হিসেবে গণনা করা হবে। অন্যদিকে, প্রধান এজেন্টরা যেসব কর্মী সরাসরি পাঠাবেন, সেগুলো আলাদাভাবে হিসাব করা হবে। এতে করে উভয় পক্ষই নিজেদের কর্মক্ষমতার আলাদা রেকর্ড রাখতে পারবে, যা ভবিষ্যতে মূল্যায়ন ও নবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনগুলো একদিকে যেমন নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজ করবে, অন্যদিকে তেমনি খাতে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব বাড়াতে সহায়ক হবে। বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠায় এবং এই কর্মীরাই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস। তাই এই খাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একটি প্রশ্ন এখনো খোলা রয়েছে। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি ইতোমধ্যে ৫০ লাখ টাকা জামানত জমা দিয়েছে, তারা কি কমানো অঙ্কের বাইরে থাকা ১৫ লাখ টাকা ফেরত পাবে—সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। বিষয়টি নিয়ে এজেন্সিগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, জামানত কমানো ও সহযোগী নিয়োগকারী ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কারের পথে এগিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা সুফল বয়ে আনে এবং প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা ও রেমিট্যান্স প্রবাহে এর প্রভাব কীভাবে প্রতিফলিত হয়।



