কক্সবাজার রুটে অবৈধ স্লিপার বাসের দৌরাত্ম্য: ঝুঁকিতে যাত্রী নিরাপত্তা ও পর্যটন

স্লিপার বাস

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্য। প্রতি বছর লাখো পর্যটক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই সমুদ্র সৈকতে ভিড় করেন। কিন্তু পর্যটনের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার আড়ালে ভয়াবহ এক নিরাপত্তা সংকট ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। অভিযোগ উঠেছে, কক্সবাজারগামী সড়কে প্রতিদিন শত শত অননুমোদিত স্লিপার বাস চলাচল করছে, যেগুলোর বড় অংশই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই রাস্তায় নামানো হয়েছে। যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অবৈধ বাসের কারণে যাত্রী নিরাপত্তা যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি পুরো পর্যটন শিল্পও ঝুঁকির মধ্যে চলে যাচ্ছে।

আরামদায়ক ভ্রমণের লোভে অনেক পর্যটক ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকায় স্লিপার বাসের টিকিট কিনছেন। দীর্ঘ পথের যাত্রায় শুয়ে যাওয়ার সুবিধা থাকায় এই বাসগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে বেশিরভাগ যাত্রী জানেন না, তারা যে বাসে উঠছেন সেটি আদতে বৈধ নয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব বাসের বড় অংশই মূলত সিঙ্গেল-ডেক চেসিসে অবৈধভাবে ডাবল-ডেক বা স্লিপার কাঠামো যুক্ত করে তৈরি করা। এতে বাসের উচ্চতা ও ওজন বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে পাহাড়ি ও বাঁকযুক্ত সড়কে।

পাবদা এক্সপ্রেস, সেন্ট মার্টিন, সেজুতি, মল্লিক, বেঙ্গল ট্যুরিস্ট, সেন্ট মার্টিন সিভিউ ও আইকনিকের মতো কয়েকটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন বাস পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। এসব যানবাহনে নিচতলায় বিজনেস ক্লাস আসন এবং ওপরের তলায় স্লিপার বেড বসানো হয়েছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের রূপান্তর কেবল অনুমোদনহীনই নয়, বরং মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সিঙ্গেল-ডেক চেসিস ডাবল-ডেক কাঠামোর অতিরিক্ত চাপ ও ভারসাম্য সামাল দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয় না।
যাত্রীদের মধ্যে আরেকটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বাস পরিচালনার অর্থনৈতিক দিক নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি স্লিপার বাসে প্রতি ট্রিপে মাত্র ১০ থেকে ১৩ জন যাত্রী থাকে। সাধারণ হিসাবে এত কম যাত্রী নিয়ে নিয়মিত বাস চালানো লাভজনক হওয়ার কথা নয়। এ নিয়ে যাত্রীদের সন্দেহ, এসব বাস অন্য কোনো অবৈধ সুবিধা বা গোপন চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। একজন যাত্রী বলেন, “এই গাড়িগুলোর কোনো রোড পারমিট নেই, কাগজপত্রও সঠিক নয়। তবুও তারা দিব্যি রাস্তায় চলছে।”

তদন্তে উঠে এসেছে, অধিকাংশ অবৈধ স্লিপার বাস ভারত থেকে আমদানি করা অশোক লেল্যান্ডের ১২ এমএফই ও ১২-মিটার চেসিস ব্যবহার করে তৈরি। এই চেসিসগুলো কেবল সিঙ্গেল-ডেক বাসের জন্য অনুমোদিত। বিআরটিএর বিধিমালা অনুযায়ী, এসব চেসিসে ডাবল-ডেক বা স্লিপার বাস নির্মাণের কোনো অনুমতি নেই। তবুও রাজধানীর গাবতলী, আমিনবাজার ও মিরপুরের বিভিন্ন ওয়ার্কশপে এসব চেসিসে অবৈধভাবে কাঠামো পরিবর্তন করে বাস নামানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাগরিকদের অভিযোগ আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। অনেকের দাবি, পুলিশের একটি অংশ নিয়মিত ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে এসব অবৈধ বাস চলাচলের সুযোগ করে দিচ্ছে। একজন অভিযোগকারী বলেন, “টাকা দিলেই সব ঠিক হয়ে যায়। কাগজপত্র দেখার নামে আসলে ঘুষ নেওয়াই মূল বিষয়।” যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করা হয়েছে, তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাস মালিক সমিতির অভিযোগও কম গুরুতর নয়। তাদের দাবি, কিছু চেসিস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বাস বিক্রির আগেই বিআরটিএর নিবন্ধন নম্বর নির্ধারণ করে দেয়। পরে একই নম্বর ব্যবহার করে একাধিক বাস রাস্তায় নামানো হয়। এতে একদিকে নিবন্ধন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বিআরটিএ ইতোমধ্যে ১২৩টি অবৈধ স্লিপার বাসের একটি তালিকা তৈরি করেছে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। তবে বাস্তবে এখনো বড় কোনো অভিযান বা কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। কক্সবাজারে বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলোক বিশ্বাস গণমাধ্যমের সামনে স্বীকার করেছেন, স্লিপার বাসগুলো স্থানীয়ভাবে রূপান্তরিত হচ্ছে। তিনি এটিকে একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত ছাড়া কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।

পরিবহন মালিক, পর্যটন ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাদের মতে, পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই অবৈধ স্লিপার বাস অপসারণ করা না হলে কক্সবাজারের পর্যটন সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের পর্যটন শিল্পের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও তারা সতর্ক করেছেন।

Read Previous

বিদেশে কর্মী পাঠানো সহজ হলো: রিক্রুটিং এজেন্সির জামানত কমাল সরকার, চালু হলো ‘সহযোগী নিয়োগকারী’ ব্যবস্থা

Read Next

হ্যালং বে: ড্রাগনের কিংবদন্তি থেকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular