
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ফিলিপাইন ভ্রমণে এসে অনেক পর্যটক ম্যানিলার বিখ্যাত মল অব এশিয়া বা অন্যান্য বড় শপিংমলকেই কেনাকাটা ও বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু রাজধানীর খুব কাছে তাগুইগ সিটির ম্যাককিনলে হিল টাউনশিপে লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ গন্তব্য, যা শুধু শপিংমল নয়— পুরোপুরি একটি ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার প্রতিকৃতি। ভেনিস গ্র্যান্ড ক্যানেল মল ইতালির ভেনিস শহরের ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্য ও রোমান্টিকতাকে ফিলিপাইনের মাটিতে নিয়ে এসেছে। ২০১৫ সালে উদ্বোধনের পর থেকে এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠেছে।
মেগাওয়ার্ল্ড কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনায় নির্মিত এই মলের নকশা করা হয়েছে রোম-ভিত্তিক বিখ্যাত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ‘পাওলো মারিওনি আর্কিটেট্টো’র সঙ্গে যৌথভাবে। ফলে প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে মূল ভেনিসের সঙ্গে অসাধারণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে ফিলিপাইন প্রপার্টি অ্যাওয়ার্ডসে ‘সেরা রিটেইল আর্কিটেকচারাল ডিজাইন’ পুরস্কার জয় করা এই স্থাপনাটি বর্তমানে দেশের সবচেয়ে রোমান্টিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে স্বীকৃত।
এই মলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো কৃত্রিম খাল বা গ্র্যান্ড ক্যানেল। নীল জলের এই খালের ওপর চলে ঐতিহ্যবাহী ভেনিশীয় গন্ডোলা। গন্ডোলিয়ারদের গাওনের সুরেলা কণ্ঠ ও দাঁড়ের মৃদু ছন্দে যখন নৌকা এগিয়ে চলে, তখন পর্যটকেরা এক অপার্থিব অনুভূতির মধ্যে ডুবে যান। গন্ডোলা ভ্রমণের সময় চারপাশের রঙিন ভবন, সেতু ও বারান্দাগুলো দেখতে দেখতে মনে হয় যেন আসল ভেনিসেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিশেষ করে সন্ধ্যায় আলোকসজ্জার সময় এই খালের দৃশ্য আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। অনেক দম্পতি এখানে গন্ডোলায় চড়ে রোমান্টিক মুহূর্ত কাটাতে পছন্দ করেন।
খালের দুই পাড়ে সাজানো হয়েছে শৌখিন বুটিক, উচ্চমানের দোকান ও আভিজাত্যপূর্ণ রেস্তোরাঁ। এখানকার অধিকাংশ রেস্তোরাঁ আসল ইতালীয় খাবারের জন্য বিখ্যাত— পাস্তা, পিৎজা, রিসোত্তো, টিরামিসুসহ নানা সুস্বাদু খাবারের স্বাদ নিতে পারবেন পর্যটকেরা। খালের পাশে বসে কফি খেতে খেতে উইন্ডো শপিং করার অভিজ্ঞতা এক কথায় অবিস্মরণীয়। ফ্যাশন, জুয়েলারি, হ্যান্ডিক্রাফট ও স্মারকদ্রব্যের দোকানগুলোতে ঘুরে সময় কাটানো যায় অনায়াসে।
মলের আরেকটি প্রধান আকর্ষণ ‘পন্তে দে আমোরে’ বা ভালোবাসার সেতু। খালের ওপর নির্মিত এই সেতু থেকে পুরো এলাকার প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়। নিচে গন্ডোলা চলাচল দেখা, আশপাশের স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করা এবং সেলফি তোলার জন্য এটি পর্যটকদের প্রিয় স্থান। অনেকে এখানে প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্ত্রী-স্বামীর সঙ্গে লক লাগিয়ে প্রতিশ্রুতির প্রতীক রেখে যান। সেতুর কাছেই রয়েছে অত্যাধুনিক ভেনিস সিনেপ্লেক্স, যেখানে সর্বশেষ হলিউড ও বলিউড সিনেমা উপভোগ করা যায়।
ভেনিস গ্র্যান্ড ক্যানেল মল শুধু দিনের বেলাতেই নয়, সন্ধ্যা ও রাতেও সমান আকর্ষণীয়। বিকেলের নরম আলোয় খালের পাড়ে হাঁটাহাঁটি, সন্ধ্যায় আলোকিত পরিবেশে গন্ডোলা ভ্রমণ এবং রাতের খাবার— প্রতিটি মুহূর্তই অনন্য। ম্যাককিনলে হিলের শান্ত ও সাজানো পরিবেশ মেট্রো ম্যানিলার ব্যস্ততার মাঝে এক টুকরো শান্তি প্রদান করে। কাছাকাছি বনিফাসিও গ্লোবাল সিটিতে অবস্থিত বিলাসবহুল হোটেলগুলো থেকে এখানে সহজেই আসা যায়।
পর্যটকদের জন্য কয়েকটি টিপস: সকালের দিকে এলে ভিড় কম থাকে এবং ছবি তোলার জন্য ভালো আলো পাওয়া যায়। গন্ডোলা রাইডের টিকিট আগে থেকে বুক করলে সুবিধা হয়। ইতালীয় রেস্তোরাঁয় খেতে চাইলে সন্ধ্যার দিকে যাওয়া উত্তম। এছাড়া আরামদায়ক জুতো পরে আসবেন, কারণ ঘুরে দেখার অনেক কিছুই আছে।
ভেনিস গ্র্যান্ড ক্যানেল মল প্রমাণ করে যে, ফিলিপাইন শুধু সমুদ্রসৈকত, দ্বীপ ও প্রকৃতির জন্যই বিখ্যাত নয়। এখানে ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের সুন্দর মেলবন্ধন ঘটেছে। যারা ম্যানিলা সফর করছেন, তাদের জন্য এটি অবশ্যই দেখার তালিকায় রাখা উচিত। কেনাকাটা, খাবার, বিনোদন ও রোমান্টিকতা— সবকিছুর এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এখানে।
ফিলিপাইনের পর্যটন শিল্পের বিকাশে এমন থিম-ভিত্তিক গন্তব্যগুলো নতুন মাত্রা যোগ করছে। ভবিষ্যতে আরও অনেক পর্যটক যে এখানে ভিড় করবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদি আপনি ফিলিপাইনে যান, তবে তাগুইগের এই ভেনিসকে মিস করবেন না। এখানে এসে আপনিও অনুভব করবেন— ভেনিস আর এত দূরে নয়!


