
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের আকাশযাত্রায় এক নতুন গৌরবময় অধ্যায় যুক্ত হলো। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে থাকা বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও দীর্ঘপাল্লার উড়োজাহাজ বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর-এর সর্বকনিষ্ঠ নারী ক্যাপ্টেন হিসেবে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদ। পদায়নপত্র হস্তান্তরের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি সম্পন্ন হয়েছে, যা দেশের নারী ক্ষমতায়ন এবং এভিয়েশন খাতের অগ্রগতির এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ক্যাপ্টেন ফারিয়েলের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের নারীদের জন্য আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। তিনি ইতিপূর্বে দেশের প্রাইভেট এভিয়েশন সেক্টরে প্রথম নারী পাইলট হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। ২০০৭ সালে ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ চালিয়ে তিনি নজর কেড়েছিলেন সবার। সেই যাত্রার ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে তিনি জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যোগ দেন। যোগদানের পর থেকে তিনি ফোকার-২৮, এয়ারবাস-৩১০, বোয়িং-৭৩৭ এবং বোয়িং-৭৭৭ সিরিজের বিভিন্ন মডেলের উড়োজাহাজ সফলভাবে পরিচালনা করেছেন। এখন বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর-এর ক্যাপ্টেন হিসেবে তার পদায়নকে তার ক্যারিয়ারের শীর্ষ অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ক্যাপ্টেন ফারিয়েলের এভিয়েশন যাত্রার পেছনে রয়েছে পরিবারের অটুট সমর্থন ও অনুপ্রেরণা। তার বড় ভাই ক্যাপ্টেন নোমান তার প্রথম পথপ্রদর্শক। ভাইয়ের দেখানো পথে তিনি প্রথমবার ককপিটে বসার স্বপ্ন দেখেন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। তার প্রশিক্ষণ শুরু হয় বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাব থেকে। পরবর্তীতে কঠোর অধ্যয়ন, প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ (সিএএবি)-এর অধীনে কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স (সিপিএল) এবং এয়ারলাইন ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স (এটিপিএল) অর্জন করেন। এই লাইসেন্সগুলো তার ক্যারিয়ারের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যাপ্টেন ফারিয়েলের এই সাফল্য বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর বিমানটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লিটের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘপাল্লার উড়োজাহাজ, যা ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে। এই উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন হওয়া মানে উচ্চতর দায়িত্ব, জটিল নেভিগেশন এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ক্যাপ্টেন ফারিয়েলের এই পদায়ন দেখিয়ে দিয়েছে যে, নারীরা এই চ্যালেঞ্জিং ক্ষেত্রেও সমানতালে এগিয়ে যেতে পারেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন মুখপাত্র এই অর্জনকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদের এই সাফল্য তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, দৃঢ় লক্ষ্য, কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো উচ্চতা অর্জন সম্ভব। আজ তিনি শুধু একজন সফল পাইলট নন, বরং অসংখ্য তরুণীদের চোখে আকাশ জয়ের স্বপ্ন জাগিয়ে তুলছেন। তার এই যাত্রা বাংলাদেশের পতাকাকে বিশ্ব আকাশে আরও উঁচুতে তুলে ধরবে।”
ক্যাপ্টেন ফারিয়েলের এই অর্জন দেশের নারী সমাজে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। অনেক তরুণী এখন এভিয়েশন ক্যারিয়ারকে সিরিয়াসলি বিবেচনা করছেন। তার গল্প শুধু একজন নারীর সাফল্যের গল্প নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীদের সম্ভাবনা ও সক্ষমতার প্রমাণ। ভবিষ্যতে আরও অনেক নারী পাইলট এই পথ অনুসরণ করে দেশের এভিয়েশনকে সমৃদ্ধ করবেন বলে আশা করা যায়।
এই ঘটনা বাংলাদেশের এভিয়েশন ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদের উড়ান অব্যাহত থাকুক, আর তার সাথে বাংলাদেশের গৌরব ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বের আকাশে।



