বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরে আসছে: পর্যটন খাতে নতুন উদ্যম এবং সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : দেড় বছরের অস্বস্তিকর দূরত্বের পর বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক আবার স্বাভাবিকতার পথে এগোচ্ছে, এবং এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে পর্যটন খাতে। দুই দেশের কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে, সম্পর্কের ‘জমে থাকা বরফ’ গলতে শুরু করেছে, যা পর্যটকদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, ভারতের নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা পর্যটনের মতো মানুষকেন্দ্রিক খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই সম্পর্কের উন্নতি দুই দেশের পর্যটকদের জন্য ভিসা সহজীকরণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন সুযোগ তৈরি করছে, যা অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে টানাপোড়েন দেখা গিয়েছে, তা পর্যটন খাতকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে যায়, যার ফলে ভিসা জটিলতা, সীমান্তে অস্থিরতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থবিরতা পর্যটকদের যাতায়াতকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে। ভারতের বিভিন্ন শহর যেমন কলকাতা, দিল্লি বা আগরতলা থেকে বাংলাদেশে আসা পর্যটকদের সংখ্যা হ্রাস পায়, এবং একইভাবে বাংলাদেশিরা ভারতের পর্যটন স্থানগুলো যেমন তাজমহল, গোয়া বা হিমালয়ের পাদদেশে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। তিস্তা চুক্তির ঝুলে থাকা এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কার্যক্রমকেও প্রভাবিত করে, যার ফলে হোটেল, ট্রাভেল এজেন্সি এবং স্থানীয় কারিগররা ক্ষতির সম্মুখীন হন। অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে চীন-ভারত প্রতিযোগিতা এই অস্থিরতাকে আরও জটিল করে তোলে, কিন্তু এখন নতুন সরকারের আগমনে পর্যটন খাতে আশার আলো দেখা যাচ্ছে।

নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর পর্যটন-কেন্দ্রিক পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের বক্তব্য অনুসারে, সব দেশের সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে, যা পর্যটনের মতো খাতে পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, ভিসা এবং রেল চলাচলের বিষয়গুলোর আলোচনা পর্যটন উন্নয়নের ভালো লক্ষণ, যদিও সীমান্ত হত্যা বা পানিবণ্টনের মতো ইস্যুগুলো সমাধান না হলে পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাবে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারতীয় মিশনগুলো ভিসা কার্যক্রম সীমিত করেছিল, যা পর্যটকদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ডিসেম্বরে ঢাকায় ঘটনাগুলোর পর ভারতের বিভিন্ন মিশনে বিক্ষোভ এবং হামলার ঘটনা পর্যটন যাত্রাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে, ফলে দুই দেশের মধ্যে পর্যটক প্রবাহ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

কিন্তু নতুন সরকারের আগমনে ভিসা পরিষেবায় দ্রুত পরিবর্তন এসেছে, যা পর্যটন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করছে। গত শুক্রবার নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ভারতীয়দের ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এবং সিলেটে ভারতের মিশনের কর্মকর্তা অনিরুদ্ধ দাস জানিয়েছেন যে, পূর্ণমাত্রায় ভিসা পরিষেবা চালুর প্রস্তুতি চলছে। বর্তমানে মেডিকেল এবং ডাবল-এন্ট্রি ভিসা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু পর্যটন ভিসা শিগগির চালু হবে, যা বাংলাদেশের সুন্দরবন, কক্সবাজার বা পাহাড়ী অঞ্চলগুলোতে ভারতীয় পর্যটকদের আকর্ষণ করবে। একইভাবে, বাংলাদেশিরা ভারতের ঐতিহাসিক স্থান যেমন জয়পুরের রাজপ্রাসাদ বা কেরালার সমুদ্রতীরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। এই ভিসা সহজীকরণ দুই দেশের পর্যটন শিল্পকে বাড়িয়ে তুলবে, যেখানে হোটেল বুকিং, ট্যুর অপারেটর এবং স্থানীয় অর্থনীতি উপকৃত হবে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে যে, এটি শুধু রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং পর্যটন-কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার অংশ।

নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার উপস্থিতি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চিঠি হস্তান্তর পর্যটন সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক সংকেত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্য অনুসারে, ভারত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে সমর্থন করে এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক জোরদার করতে চায়, যা পর্যটনের মাধ্যমে মানুষে মানুষে বন্ধনকে শক্তিশালী করবে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান সম্পর্কের পথে বাধা হবে না, এবং সম্পর্ক কোনো একক ইস্যুতে আটকে থাকবে না—এটি পর্যটনের মতো খাতে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, এটি আবেগের পরিবর্তে কৌশলগত পর্যটন উন্নয়নের প্রয়াস, যা দুই দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রচার করবে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা পর্যটন খাতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন যে, ভারত-বাংলাদেশ রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর পরীক্ষা চলছে, এবং ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এই রেল যোগাযোগ চালু হলে পর্যটকদের জন্য সহজ যাতায়াত সম্ভব হবে, যেমন কলকাতা থেকে ঢাকা বা চট্টগ্রামে আসা। এটি বাণিজ্যের পাশাপাশি চিকিৎসা পর্যটন, শিক্ষা পর্যটন এবং সাধারণ পর্যটনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ জঙ্গল বা ভারতের ডার্জিলিংয়ের চা বাগানে যাওয়া পর্যটকদের জন্য রেল যোগাযোগ একটি সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প হয়ে উঠবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন যে, এটি রাজনৈতিক আস্থার পরীক্ষা হিসেবে কাজ করবে এবং পর্যটন শিল্পকে বুস্ট দেবে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে রাজশাহীতে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমারের বক্তব্য পর্যটনের সাংস্কৃতিক দিকটিকে তুলে ধরেছে। তিনি বলেছেন যে, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক অকৃত্রিম, এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির যৌথ ঐতিহ্য দুই দেশের মানুষকে একত্রিত করে। এই ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো পর্যটন প্রচারের জন্য আদর্শ, যেমন দুই দেশের উৎসব যেমন দুর্গাপূজা বা ঈদ উপলক্ষে যৌথ ট্যুর প্যাকেজ তৈরি করা। কূটনৈতিক মহলের মতে, ভিসা, রাজনৈতিক বার্তা, সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা এবং যোগাযোগের পুনর্বিন্যাস দুই দেশকে পর্যটন-কেন্দ্রিক সহযোগিতার পথে নিয়ে যাচ্ছে, যদিও প্রক্রিয়াটি হিসেবি এবং ধীরগতির।

তবে এই বরফ গলার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে। আঞ্চলিক রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা সত্ত্বেও, দুই দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে আশাবাদী সুর বিরাজ করছে। অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের সতর্কবাণী অনুসারে, সম্পর্কে ভারসাম্য থাকতে হবে, এবং এটি জনগণকেন্দ্রিক হওয়া উচিত, না কোনো দল বা ব্যক্তির সাথে সীমাবদ্ধ। পর্যটন খাতে এই ভারসাম্য নিশ্চিত করলে, দুই দেশের অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় উভয়ই উন্নত হবে। উদাহরণস্বরূপ, যৌথ পর্যটন প্রকল্প যেমন গঙ্গা-পদ্মা নদী ক্রুজ বা সীমান্তবর্তী উৎসবগুলো চালু করা যেতে পারে, যা লক্ষ লক্ষ পর্যটককে আকর্ষণ করবে। সামগ্রিকভাবে, এই সম্পর্কের উন্নতি পর্যটনকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক হাতিয়ার করে তুলতে পারে, যা দুই দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সাহায্য করবে।

এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প, যা ইতিমধ্যে কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের মুখে, নতুন গতি পাবে। ভারতীয় পর্যটকরা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন সিলেটের চা বাগান বা রাঙ্গামাটির পাহাড়ী লেকে আকৃষ্ট হবেন, যখন বাংলাদেশিরা ভারতের বৈচিত্র্যময় স্থান যেমন রাজস্থানের মরুভূমি বা অন্ধ্রপ্রদেশের মন্দিরগুলো অন্বেষণ করতে পারবেন। ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ইতিমধ্যে যৌথ প্যাকেজ তৈরির পরিকল্পনা করছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে। তবে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে পর্যটন টেকসই হয়। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এই পুনরুদ্ধার পর্যটন খাতকে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা দুই দেশের অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও মজবুত করবে।

প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার

Read Previous

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালু করার উদ্যোগ

Read Next

মালদ্বীপের জাতীয় এয়ারলাইন্স ‘মালদিভিয়ান’ ঢাকায় সিটি অফিস উদ্বোধন করেছে, ১২ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে ঢাকা-মালে সরাসরি ফ্লাইট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular