
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: ঢাকার ধামরাইয়ের রথখোলা এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে ১২৫ বছরের প্রাচীন বনিকবাড়ি। একসময় কাঁসাশিল্পের জন্য খ্যাত এই বাড়ি এখন সমানভাবে পরিচিত দুর্গাপূজার জন্যও। প্রায় এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলে আসছে এখানে দুর্গাপূজা। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মিলনমেলা।
বাড়িটির মালিক বিখ্যাত কাঁসাশিল্পী সুকান্ত বনিক। নিচতলায় রয়েছে কাঁসাশিল্পের প্রদর্শনীকেন্দ্র ও কারখানা, আর ওপর তলায় তাঁদের বসবাস। পূজার মূল আকর্ষণ অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা, যার উচ্চতা ৮ ফুট আর ওজন ৫২০ কেজি। প্রতিমাটি শুধু পূজার সময় বের করা হয়, আর বছরের বাকি সময় বাক্সবন্দী থাকে। বিসর্জনের পরিবর্তে এখানে পালিত হয় অনন্য ‘দর্পণ বিসর্জন’। আয়নায় প্রতিমার প্রতিবিম্ব দেখিয়ে সেই আয়নাকেই বিসর্জন দেওয়া হয় দশমীতে।

সুকান্ত বনিকের স্ত্রী মানসী বনিক এই পূজার আরেক কেন্দ্রবিন্দু। তিনি নিজে একজন চিত্রশিল্পী, দেশ–বিদেশে বহু প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। বাড়ির নিচতলায় তাঁর স্টুডিওও রয়েছে। পূজার সময় রান্নাবান্নার দায়িত্বও তিনি নেন নেতৃত্বে। মহালয়া থেকে দশমী পর্যন্ত চলে নিরামিষ রান্না। এই সময়ে ব্রাহ্মণরা পূজার ভোগ রান্না করেন, বাড়ির বউরা রান্না করেন পরিবারের জন্য, আর বাবুর্চিরা হাজারো অতিথির জন্য। দশমীতে বিসর্জনের পর আবার আমিষ রান্না শুরু হয়।
প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বনিকবাড়ি থাকে দর্শনার্থীদের জন্য খোলা। আশপাশের গ্রাম তো বটেই, দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ আসেন। অষ্টমীতে ঢাকার বিভিন্ন দূতাবাস থেকেও অতিথিরা আসেন এবং পূজার খাবার উপভোগ করেন।

খাবারের তালিকা সমৃদ্ধ—ক্ষীরের নাড়ু, নারকেলের তক্তি, চিড়ার মোয়া, খেজুরের গুড়ের মুড়কি, আখের গুড়ের মুড়কি, পায়েস, তালের বড়া, লাড্ডু, বিভিন্ন সবজির তরকারি, আলুর দম, লাবড়া, আনারস ও আমের চাটনি, লুচি, পোলাও, খিচুড়ি, পিঠাপুলি, মালপোয়া, পাটিসাপটা। সব খাবারই পরিবেশন করা হয় কাঁসা, ব্রোঞ্জ আর পাথরের বাসনে। ঘিয়ের বিশেষ ঘ্রাণে ভরপুর এসব রান্না আলাদা মাত্রা যোগ করে।
বনিকবাড়ির দুর্গাপূজা এখন শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, হয়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যটনেরও আকর্ষণ। যারা প্রাচীন স্থাপত্য, লোকশিল্প আর ঐতিহ্যবাহী পূজার সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখতে চান, তাঁদের জন্য ধামরাইয়ের এই বনিকবাড়ি এক অনন্য গন্তব্য।



