
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বাংলাদেশের পর্যটন খাত সম্ভাবনায় ভরপুর, কিন্তু বাস্তবতায় ক্রমেই সংকুচিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নদী, পাহাড়, সমুদ্র, বন সবই আছে। তবুও আন্তর্জাতিক পর্যটনের মানচিত্রে বাংলাদেশ এখনো প্রান্তিক। এর পেছনে সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হিসেবে উঠে আসে দূর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। প্রশ্ন হলো, শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রই কি দায়ী, নাকি এই সংকোচনে আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত দায়ও রয়েছে? বিষয়টি আবেগ নয়, তথ্য ও বাস্তবতা দিয়ে দেখার সময় এসেছে।
পর্যটন খাত মূলত আস্থা নির্ভর একটি শিল্প। পর্যটক যেখানে যাবে, সেখানে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা, সেবা ও পূর্বানুমেয় পরিবেশ চায়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সেই আস্থাকে বারবার ধাক্কা দিয়েছে। হরতাল, অবরোধ, সহিংস কর্মসূচি, আকস্মিক সড়ক বন্ধ, পরিবহন সংকট এসব কারণে ভ্রমণ পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক পর্যটক তো বটেই, দেশীয় পর্যটকরাও শেষ মুহূর্তে ভ্রমণ বাতিল করতে বাধ্য হন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে হোটেল, রিসোর্ট, ট্রাভেল এজেন্সি, গাইড, পরিবহন খাত এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর।
রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি দূর্নীতি পর্যটন খাতকে ভিতর থেকে ক্ষয় করছে। বড় প্রকল্প থেকে শুরু করে ছোট পর্যটন সেবায় পর্যন্ত দূর্নীতির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের নামে প্রকল্প নেয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে কাজের মান থাকে প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দের বড় অংশই সঠিকভাবে কাজে লাগে না। ফলাফল হিসেবে তৈরি হয় অর্ধসমাপ্ত বা নিম্নমানের স্থাপনা, যা পর্যটকের অভিজ্ঞতাকে নেতিবাচক করে তোলে। পর্যটন স্পটের সৌন্দর্য বাড়ানোর বদলে সেখানে দেখা যায় অব্যবস্থাপনা, অপরিচ্ছন্নতা ও বিশৃঙ্খলা।
দূর্নীতি শুধু বড় পর্যায়ে নয়, দৈনন্দিন পর্যটন অভিজ্ঞতাতেও উপস্থিত। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি, অনুমোদনহীন গাইড, ভুয়া প্যাকেজ, বিদেশি পর্যটকের কাছ থেকে বেশি টাকা নেওয়ার প্রবণতা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। একজন পর্যটক খারাপ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলে সে শুধু আর নিজে আসে না, অন্যদেরও নিরুৎসাহিত করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত, যা দেশের ইমেজকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করে।
এখানে এসে প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—এই দায় কি শুধু সরকার বা রাজনৈতিক দলের? বাস্তবতা হলো, দায় একক নয়। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা অবশ্যই বড় কারণ। কিন্তু আমরা যারা নাগরিক, উদ্যোক্তা, সেবা প্রদানকারী, স্থানীয় বাসিন্দা, তারাও দায় এড়াতে পারি না। অনেক সময় আমরা নিজেরাই অনিয়মকে স্বাভাবিক ধরে নিই। পর্যটককে বাড়তি দাম নিলে সেটাকে “চলেই” বলে মেনে নিই। পরিবেশ দূষণ, পাহাড় কাটা, সৈকতে ময়লা ফেলা এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনীহা দেখাই। অথচ এগুলোই পর্যটন খাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষেত্রেও আমাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু সহিংসতা ও সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত করা পর্যটনসহ পুরো অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যখন আমরা নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকি বা এটাকে অনিবার্য বলে মেনে নিই, তখন সেই সংস্কৃতিই শক্তিশালী হয়। পর্যটন খাত তখন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বলি হয়ে যায়।
পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একই ধরনের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কা, নেপাল কিংবা ভিয়েতনাম অনেক বেশি পর্যটক আকর্ষণ করতে পারছে। এর পেছনে তাদের তুলনামূলক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নত সেবা ব্যবস্থা এবং দূর্নীতির বিরুদ্ধে তুলনামূলক কঠোর অবস্থান বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ যদি এই জায়গাগুলোতে পিছিয়ে থাকে, সেটি শুধু সরকারের ব্যর্থতা নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক ব্যবস্থার দুর্বলতা।
তবে হতাশার মধ্যেও সম্ভাবনা আছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন দরকার। পর্যটককে অতিথি হিসেবে সম্মান করা, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, পরিবেশ রক্ষা, স্থানীয় সংস্কৃতির মর্যাদা বজায় রাখা এগুলো রাষ্ট্রের একক দায়িত্ব নয়। এগুলো সামাজিক চর্চা হতে হবে। একজন স্থানীয় দোকানদার, একজন গাইড, একজন হোটেল কর্মী—প্রত্যেকের আচরণই দেশের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, দূর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের পর্যটন খাত সংকুচিত হওয়ার দায় বহুমাত্রিক। সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় সবচেয়ে বেশি হলেও, আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়ও কম নয়। আমরা যদি অনিয়মের সুবিধাভোগী হতে থাকি, যদি স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নষ্ট করি, তাহলে পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়াবে না। এই খাতকে বাঁচাতে হলে দায় স্বীকার করতে হবে সবাইকে। কারণ পর্যটন শুধু অর্থনীতির খাত নয়, এটি দেশের ভাবমূর্তি, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



