
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : দুবাই মানেই শুধু আকাশচুম্বী ভবন বা বিলাসবহুল শপিং মল নয়; শহরটি বরাবরই নতুন নতুন পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরিতে বিশ্বকে চমকে দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবার যুক্ত হলো আরও একটি ব্যতিক্রমী আকর্ষণ—বিশ্বের প্রথম উদ্দেশ্য-নির্মিত ‘গোল্ড স্ট্রিট’। ইথ্রা দুবাইয়ের উদ্যোগে নতুন চালু হওয়া দুবাই গোল্ড ডিস্ট্রিক্টের অংশ হিসেবে এই গোল্ড স্ট্রিট গড়ে উঠবে, যা পর্যটন ও বাণিজ্য—দুটোকেই একসাথে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিত।
গোল্ড স্ট্রিট মূলত এমন একটি গন্তব্য হতে যাচ্ছে, যেখানে পর্যটকরা শুধু সোনা কেনাকাটাই করবেন না, বরং সোনাকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতার স্বাদ পাবেন। খুচরা স্বর্ণের দোকান, সোনার বুলিয়ান ব্যবসা এবং পাইকারি কার্যক্রম এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হওয়ায় এটি হবে বিশ্বের প্রথম এমন স্থান, যেখানে সোনার পুরো ভ্যালু চেইন পর্যটকদের সামনে উন্মুক্ত থাকবে। ফলে দুবাই ভ্রমণে আসা দর্শনার্থীদের জন্য এটি একটি আলাদা আকর্ষণ হিসেবে জায়গা করে নেবে।
ডেভেলপারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গোল্ড স্ট্রিটের নকশা হবে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। এখানে বাস্তব সোনার উপাদান ব্যবহার করে স্থাপত্য নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা এটিকে শুধু বাণিজ্যিক নয়, বরং একটি আইকনিক পর্যটন স্থাপনায় রূপ দেবে। দিনের আলোয় ঝলমলে স্বর্ণাভ রূপ আর রাতে আলোকসজ্জায় ঝকঝকে দৃশ্য—এই স্ট্রিট পর্যটকদের ছবি তোলা ও হাঁটাহাঁটির জন্য একটি জনপ্রিয় স্পট হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নকশা ও নির্মাণের বিস্তারিত ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হবে, যা পর্যটন খাতের আগ্রহ আরও বাড়াবে।
গোল্ড স্ট্রিট যে জেলায় অবস্থিত হবে, সেই দুবাই গোল্ড ডিস্ট্রিক্ট নিজেই একটি বড় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। এই জেলায় ইতোমধ্যেই সোনা, গয়না, সুগন্ধি, প্রসাধনী ও লাইফস্টাইল পণ্যের এক হাজারের বেশি খুচরা বিক্রেতা রয়েছে। জাওহারা জুয়েলারি, মালাবার গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস, আল রোমাইজান এবং তানিষ্ক জুয়েলারির মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর উপস্থিতি পর্যটকদের আস্থা ও আকর্ষণ দুটোই বাড়িয়েছে। বিশেষ করে গহনা কেনাকাটার জন্য মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটকদের কাছে এই এলাকা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
পর্যটনের দিক থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো জয়ালুক্কাসের পরিকল্পিত ফ্ল্যাগশিপ স্টোর। প্রায় ২৪,০০০ বর্গফুট আয়তনের এই স্টোরটি মধ্যপ্রাচ্যে ব্র্যান্ডটির সবচেয়ে বড় শোরুম হবে বলে জানানো হয়েছে। এত বড় আকারের একটি স্টোর শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, বরং একটি ভিজ্যুয়াল ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাও দেবে, যা পর্যটকদের দীর্ঘ সময় ধরে আকৃষ্ট করে রাখবে।
দুবাই গোল্ড ডিস্ট্রিক্টকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য আরও সুবিধাজনক করতে এখানে ছয়টি হোটেলে এক হাজারের বেশি কক্ষ রাখা হয়েছে। ব্যবসায়ী পর্যটক থেকে শুরু করে অবকাশ যাপনকারী ভ্রমণকারী—সব ধরনের দর্শনার্থীর কথা মাথায় রেখেই এই অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ২০২৫ সালে বিগ বাস দর্শনীয় স্থান পরিষেবা চালু হওয়ায় জেলার সঙ্গে দুবাইয়ের অন্যান্য পর্যটন স্পটের যোগাযোগ আরও সহজ হয়েছে। ফলে স্বর্ণ কেনাকাটার পাশাপাশি পর্যটকরা সহজেই শহরের অন্যান্য আকর্ষণ ঘুরে দেখতে পারছেন।
ইথ্রা দুবাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৪৭টিরও বেশি দেশের দর্শনার্থী এই জেলায় ভ্রমণ করেছেন। এই সংখ্যা প্রমাণ করে যে দুবাই গোল্ড ডিস্ট্রিক্ট ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে গোল্ড স্ট্রিটের ঘোষণা দুবাইয়ের পর্যটন মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পর্যটনের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক গুরুত্বও এই প্রকল্পের একটি বড় দিক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় ৫৩.৪১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনা রপ্তানি করেছে, যার প্রধান গন্তব্য ছিল সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ভারত, হংকং ও তুর্কিয়ে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভৌত স্বর্ণ বাণিজ্যের গন্তব্য হিসেবে পরিচিত এই দেশ এখন সেই অবস্থানকে পর্যটন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আরও দৃশ্যমান করতে চাইছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গোল্ড স্ট্রিট শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়; এটি হবে দুবাইয়ের স্বর্ণ ঐতিহ্য, আধুনিক বাণিজ্য এবং পর্যটন অভিজ্ঞতার সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। লুতাহ জানান, এই জেলা দুবাইয়ের স্বর্ণ ব্যবসার বাস্তুতন্ত্রকে আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীদের জন্য আরও উন্মুক্ত করবে। গালাদারি বলেন, একটি একক বাণিজ্যিক অঞ্চলে ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের একত্রিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
গোল্ড স্ট্রিটের নির্মাণ সময়সীমা ও কারিগরি বিবরণ ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হবে। তবে স্পষ্টভাবে বলা যায়, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দুবাইয়ের পর্যটন খাতে এটি একটি নতুন আইকনিক গন্তব্য হিসেবে যুক্ত হবে, যেখানে স্বর্ণ শুধু কেনার বস্তু নয়, বরং দেখার, অনুভব করার এবং উপভোগ করার একটি অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে।
সূত্র: গাল্ফ নিউজ



