
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জনপদ তেঁতুলিয়া উপজেলা এখন আর শুধু শীতের সকালের কুয়াশা কিংবা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্যই পরিচিত নয়। সাম্প্রতিক সময়ে এলাকাটি নতুন এক পরিচয় পেয়েছে—টিউলিপের রঙিন বাগান। পাঁচ রঙের প্রায় ১৪ হাজার টিউলিপ ফুলে ভরে উঠেছে তেঁতুলিয়ার সীমান্তবর্তী গ্রাম দর্জিপাড়া। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ ভিড় করছেন এই বাগান দেখতে। অনেকের চোখে এটি যেন এক টুকরো নেদারল্যান্ডস।
এই উদ্যোগ নতুন নয়, তবে এবছর এর ব্যাপ্তি ও সাড়া আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। টানা পঞ্চম বছরের মতো টিউলিপ চাষ আয়োজন করা হয়েছে দর্জিপাড়ায়। প্রায় ০.৬০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই খামার-ভিত্তিক বাগানে লাল, হলুদ, গোলাপি ও অন্যান্য উজ্জ্বল রঙের টিউলিপ সারিবদ্ধভাবে ফুটে আছে। লালিবেলা, ডেনমার্ক, স্ট্রং গোল্ড ও মিস্টিক ভ্যান এইজকের মতো জাতগুলো দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে।
এই বাগানের পেছনে রয়েছে এক ব্যতিক্রমী সামাজিক উদ্যোগ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ESDO)–এর তত্ত্বাবধানে দশজন প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তা এই প্রকল্পটি পরিচালনা করছেন। ২০২২ সালে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন তেঁতুলিয়ার স্থানীয় অর্থনীতিতে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলছে। শুধু ফুল চাষ নয়, এটি নারীর ক্ষমতায়ন এবং বিকল্প আয়ের উৎস তৈরির একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বাগানে প্রবেশ করতে দর্শনার্থীদের টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। প্রবেশমুখেই চোখে পড়ে নান্দনিক সাজসজ্জা ও পরিকল্পিত ল্যান্ডস্কেপ। বিশেষ শেডের মাধ্যমে সূর্যালোক ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যাতে টিউলিপের জন্য প্রয়োজনীয় ঠান্ডা পরিবেশ বজায় থাকে। বাগানের ভেতরে কেউ ব্যস্ত সেলফি তুলতে, কেউ আবার প্রিয়জনের জন্য টিউলিপ কিনছেন স্মারক হিসেবে। পুরো পরিবেশে এক ধরনের উৎসবমুখর আবহ তৈরি হয়।
স্থানীয় কৃষকরা জানাচ্ছেন, টিউলিপ চাষ সহজ কাজ নয়। নেদারল্যান্ডস থেকে আমদানি করা প্রতিটি বাল্বের দাম প্রায় ৮০ টাকা। সঠিক তাপমাত্রা, নিয়মিত পরিচর্যা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করেই এই ফুল ফোটাতে হয়। দিনের বেলায় প্রায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতে ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রা টিউলিপের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। রোপণের ১৮ থেকে ২০ দিনের মধ্যে কুঁড়ি আসে, আর অনুকূল পরিবেশে ফুল ২৫ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত টিকে থাকে। প্রতিটি ফুলের কাঠি প্রায় ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, এবং চাহিদা ভালো থাকায় স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই অঞ্চলের আবহাওয়া টিউলিপ চাষের জন্য উপযোগী প্রমাণিত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ ব্যবহার করে বিদেশি ফুলের জাতকে দেশীয় জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে টিউলিপ চাষ সম্প্রসারণের জন্য কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ESDO–এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহাম্মদ শহীদ উজ জামান জানান, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র কৃষকদের স্বাবলম্বী করা এবং বিদেশ থেকে ফুল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো। তাঁর ভাষায়, কয়েক বছর আগের একটি স্বপ্ন আজ বাস্তব রূপ নিয়েছে। এর মাধ্যমে তেঁতুলিয়ায় ইকো-কমিউনিটি পর্যটনের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
দিনভর খোলা থাকা এই টিউলিপ উদ্যানে প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে। পর্যটন ও কৃষির এই মেলবন্ধন সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। তেঁতুলিয়ার টিউলিপ বাগান দেখিয়ে দিচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা আর নিষ্ঠা থাকলে বিদেশি ধারণাও স্থানীয় বাস্তবতায় সফলভাবে রূপ নিতে পারে।
প্রতিবেদক : ইসলাম রাইসুল



