
পর্যটন সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বুকে ছড়িয়ে থাকা স্বচ্ছ জলরাশি, হিজল-করচের মুগ্ধ করা ছায়া, বর্ষায় দূর আকাশে মেঘের খেলা আর শীতে হাজারো পাখির কলকাকলি—সব মিলিয়ে এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার টাঙ্গুয়ার হাওর। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট, অর্থাৎ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। কিন্তু সেই গর্ব আজ ধ্বংসের মুখে, মূলত পর্যটনের নামে বেপরোয়া ব্যবস্থাপনার কারণে।
বর্ষা ও শীত—দুই মৌসুমেই আলাদা সৌন্দর্যে মোহিত করে এই হাওর। বর্ষায় জলরাশি যখন দিগন্ত ছুঁই ছুঁই, তখন দেশজুড়ে নানা প্রান্ত থেকে হাউজবোট ও স্পিডবোটে ভ্রমণপিপাসুরা ভিড় জমান এই স্বর্গভূমিতে। প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণহীনতায়, এই সৌন্দর্য উপভোগের প্রবণতা এখন হাওরের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।

টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৯৯৯ সালে একে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালে এটি রামসার তালিকায় যুক্ত হয়। সেই স্বীকৃতি থাকার পরও হাওরে কোনো কার্যকর নজরদারির ব্যবস্থা নেই। ফলে হিজল-করচের শ্বাসমূল, পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল, মাছের প্রজননক্ষেত্র—সবই আজ পর্যটনের চাপে নাজুক।
বর্তমানে হাওরে চলাচল করছে প্রায় দুই শতাধিক হাউজবোট, অধিকাংশই নিয়মবহির্ভূত। এসব হাউজবোটে উচ্চ শব্দে গানবাজনা, ইঞ্জিনের বিকট আওয়াজ ও যত্রতত্র পলিথিনসহ বর্জ্য ফেলায় জলজ জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। যেখানে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিষিদ্ধ, সেখানে সেগুলোই চলাচল করছে প্রশাসনের চোখের সামনে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. কাইয়ুম, মঞ্জুরা বেগম ও আব্দুল খালেক জানান, হাওরের শান্ত পরিবেশ আজ শুধুই অতীত। দিনে-রাতে উচ্চ শব্দের কারণে শিশু-বৃদ্ধ সকলেই অতিষ্ঠ। পাখিরা আগের মতো আসে না, মাছও কমে গেছে। আগে হাওরে শত শত প্রজাতির পাখি দেখা যেত, এখন সংখ্যাটা দিন দিন কমছে।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ জরিপে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের শীত মৌসুমে টাঙ্গুয়ায় ৪৯ প্রজাতির মাত্র ৪৩ হাজার ৫১৬টি পাখি দেখা গেছে। যেখানে ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯১ হাজার ২৩৬। গত ৭ বছরে পাখির সংখ্যা কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। এই হ্রাসের পেছনে প্রধান কারণ বলা হচ্ছে—মানবসৃষ্ট শব্দদূষণ ও পরিবেশদূষণ।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী সামিরা রহমান বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য আজ বাণিজ্যের যন্ত্রনায় ক্লান্ত। পর্যটন যেন প্রাকৃতিক সম্পদের ধ্বংসযজ্ঞ না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে এখনই।”
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, হাওরের পরিবেশ রক্ষায় তারা কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। উচ্চ শব্দে গানবাজনার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করছে এবং হাউজবোট নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা তৈরি হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস জানান, “হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। পর্যটন হোক পরিবেশবান্ধব, এটাই আমাদের চাওয়া।”
টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে এখনই চাই সমন্বিত উদ্যোগ—পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতি, স্থানীয়দের অংশগ্রহণ, কঠোর তদারকি এবং সচেতনতার চর্চা। তা না হলে একদিন হয়তো এই রামসার স্বীকৃতি হারিয়ে যাবে, হারিয়ে যাবে প্রাকৃতিক সেই রূপকথাও।



