১৮/০৪/২০২৬
৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘ পর্যটনের নতুন রোডম্যাপ: ২০২৭ সালের টেকসই পর্যটন বছরের দিকে অগ্রসর

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : জাতিসংঘ পর্যটন সংস্থা সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা বিশ্বব্যাপী পর্যটন খাতকে আরও টেকসই এবং স্থিতিস্থাপক করে তুলতে সাহায্য করবে। ২০২৭ সালকে আন্তর্জাতিক টেকসই ও স্থিতিস্থাপক পর্যটন বছর হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে, এই সংস্থা একটি বিস্তারিত রোডম্যাপ উন্মোচন করেছে। এই রোডম্যাপটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের নির্দেশনা অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে এবং এতে নীতিগত আলোচনা থেকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনার দিকে স্থানান্তরের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যটনকে শুধু অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি নয়, বরং পরিবেশগত এবং সামাজিক স্থায়িত্বের একটি মূল উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী পর্যটন শিল্প, যা কোভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, এই রোডম্যাপের মাধ্যমে নতুন দিশা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রোডম্যাপটি মাদ্রিদে উপস্থাপিত হয়েছে এবং এতে জাতিসংঘ পর্যটনের সদস্য রাষ্ট্রগুলির সাথে সমন্বিত প্রচেষ্টার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের আগের বছরগুলিতে এই কাঠামোর মাধ্যমে পর্যটনকে টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে স্থাপন করা হবে। সংস্থার পর্যটন ও স্থায়িত্ব সংক্রান্ত কমিটি (সিটিএস) এই পরিকল্পনার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই কমিটি একটি সহযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোডম্যাপটিকে সমর্থন করেছে, যাতে সদস্য দেশগুলির অভিজ্ঞতা এবং চাহিদা প্রতিফলিত হয়। পর্যটন খাতে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য এই ধরনের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি, কারণ বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে পর্যটন শিল্প প্রায়শই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই রোডম্যাপটি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন কৌশল প্রস্তুত করতে সাহায্য করবে, যেমন পরিবেশবান্ধব পর্যটন মডেলের প্রচার, স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার।

জাতিসংঘ পর্যটনের মহাসচিব শাইখা আল নুওয়াইস এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন যে স্থায়িত্ব এবং স্থিতিস্থাপকতাকে কোনো স্থির লক্ষ্য নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, “২০২৭ সালের আন্তর্জাতিক টেকসই এবং স্থিতিস্থাপক পর্যটন বছর, শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থা হিসেবে জাতিসংঘের পর্যটনকে ২০৩০-পরবর্তী এজেন্ডার মধ্যে পর্যটনকে সত্যিকার অর্থে রূপান্তরকারী খাত হিসেবে স্থাপনে আমাদের সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে সমর্থন করার সুযোগ দেবে।” এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে এই বছরটি শুধু একটি ঘোষণা নয়, বরং বিশ্বব্যাপী পর্যটনের ভবিষ্যত গড়ে তোলার একটি প্ল্যাটফর্ম। ২০৩০ এজেন্ডা, যা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অন্তর্ভুক্ত করে, পর্যটনকে একটি মূল অংশ হিসেবে দেখে। এর মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাস, লিঙ্গ সমতা, জলবায়ু কর্মকাণ্ড এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মতো লক্ষ্যগুলি রয়েছে, যেখানে পর্যটন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। মহাসচিবের এই দৃষ্টিভঙ্গি পর্যটনকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসকে তুলে ধরে।

মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত সিটিএসের সভায় এই রোডম্যাপকে স্বাগত জানানো হয়েছে। কমিটি সদস্য রাষ্ট্রগুলির অগ্রাধিকারের সাথে জাতিসংঘ পর্যটনের সম্পৃক্ততার প্রশংসা করেছে এবং ২০২৭ সালের অনেক আগেই গতিশীলতা তৈরির উপর নতুন নেতৃত্বের জোরের কথা উল্লেখ করেছে। কমিটির সভাপতি এবং কোস্টারিকার পর্যটনমন্ত্রী উইলিয়াম রদ্রিগেজ লোপেজ বলেছেন, “এই উদ্যোগ দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতিগুলিকে সমন্বিত পদক্ষেপে রূপান্তরিত করার সুযোগ করে দেয়। পর্যটনের নেতা হিসেবে, আমরা ধারাবাহিকভাবে এই খাতের রূপান্তরমূলক সম্ভাবনা এবং জাতীয় ও বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডাগুলিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরে থাকি, যার মধ্যে জলবায়ু কর্মকাণ্ড এবং ২০৩০ সালের পরেও প্রতিফলন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।আন্তর্জাতিক বর্ষ এই ভাগ করা বোঝাপড়াকে আরও সুনির্দিষ্ট এবং সমন্বিত পদক্ষেপে রূপান্তরিত করার একটি অনন্য সুযোগ প্রদান করে।” এই মন্তব্যগুলি থেকে বোঝা যায় যে এই রোডম্যাপটি শুধু পরিকল্পনা নয়, বরং বাস্তবায়নের একটি পথনির্দেশক। কোস্টারিকার মতো দেশগুলি, যা পরিবেশবান্ধব পর্যটনের জন্য বিখ্যাত, এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দিতে পারে এবং অন্যান্য দেশগুলিকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

জাতিসংঘ পর্যটন জানিয়েছে যে সদস্য রাষ্ট্রগুলির একটি স্টিয়ারিং কমিটি এই প্রস্তুতি প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করবে, যা সিটিএসের মধ্যে নোঙ্গর করা হবে। সংস্থার নির্বাহী পরিষদ আঞ্চলিক কমিশনের সভাগুলির সময় অনুষ্ঠিত পরামর্শগুলি তদারকি করবে এবং মতামত সংগ্রহ করবে। এই কাঠামোটি নিশ্চিত করবে যে রোডম্যাপটি বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা অনুসারে অভিযোজিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া যেতে পারে, যখন ইউরোপে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ফোকাস করা যাবে। পর্যটন ও স্থায়িত্ব কমিটি, যা নির্বাহী পরিষদের একটি সহায়ক সংস্থা, টেকসই পর্যটনের উপর জাতিসংঘ পর্যটনের কর্মসূচী বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য দায়ী। এই কমিটির মাধ্যমে নিয়মিত মূল্যায়ন এবং সংশোধন নিশ্চিত করা হবে, যাতে রোডম্যাপটি গতিশীল থাকে।

এই রোডম্যাপটি ২০২৭ সালের আগে জাতীয় ও আঞ্চলিক উদ্যোগগুলিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। এটি সরকার এবং শিল্প অংশীদারদের বিশ্বব্যাপী পর্যটনে স্থায়িত্ব এবং স্থিতিস্থাপকতা এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি স্পষ্ট কাঠামো প্রদান করবে। পর্যটন শিল্পের অংশীদাররা, যেমন হোটেল চেইন, এয়ারলাইনস এবং ট্যুর অপারেটররা, এই রোডম্যাপে অংশগ্রহণ করে তাদের ব্যবসায়িক মডেলগুলিকে পরিবেশবান্ধব করে তুলতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, কার্বন নির্গমন হ্রাস, জৈবিক বৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতির সমর্থনের মতো উদ্যোগগুলি এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এছাড়া, এই উদ্যোগটি বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করবে, যাতে পর্যটকরা নিজেরাই টেকসই পর্যটনের পক্ষে সচেতন হন। ফলে, পর্যটন খাতটি শুধু পুনরুদ্ধার নয়, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এই রোডম্যাপের সাফল্য নির্ভর করবে সকল অংশীদারের সহযোগিতার উপর, এবং এটি বিশ্বব্যাপী একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।

সূত্র: জাতিসংঘ পর্যটন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।

Read Previous

দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: রেকর্ড আসন ধারণক্ষমতায় বিশ্বের শীর্ষস্থান অটুট

Read Next

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের উদ্ভাবনী পদক্ষেপ: আসন্ন গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার তথ্য প্রাপ্তির সহজ চারটি উপায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular