চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠছে নতুন পর্যটন অঞ্চল

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : চট্টগ্রামের মানুষ অনেকদিন ধরেই কর্ণফুলীর পাশের বিস্তীর্ণ নদীতীরকে আরও প্রাণবন্ত ও আধুনিকভাবে গড়ে উঠতে দেখতে চাইছিল। এবার সেই অপেক্ষার শেষ হতে চলেছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম তীরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার জুড়ে একটি নতুন পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। নাম রাখা হয়েছে কর্ণফুলী রিভারভিউ পার্ক

এটা শুধু আরেকটি পার্ক তৈরির প্রকল্প নয়; শহরের পুরোনো জনপদ বাকলিয়াকে ঘিরে নতুন করে জমে ওঠা জীবনের গল্প। কর্ণফুলীর বুকে গড়ে ওঠা দীর্ঘ নতুন রাস্তার ধারে যে মনোরম পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটা কাজে লাগাতেই এই উদ্যোগ। লক্ষ্য একটাই—নদীর সৌন্দর্যকে মানুষের কাছে আরও কাছে আনা।

নদীতীরে বদলে যাবে পুরো এলাকার চেহারা

অনেকেই জানেন, বাকলিয়া চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। কিন্তু উন্নয়নের দিক থেকে দীর্ঘদিন ধরেই পিছিয়ে। নতুন এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকার পুরো পরিবেশই পাল্টে যেতে পারে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পর্যটন অঞ্চল তৈরি হলে এখানে বিনোদনের সুযোগ বাড়বে, ছোট ব্যবসা গড়ে উঠবে এবং ধীরে ধীরে এটি শহরের অন্যতম বড় আবাসিক অঞ্চলে রূপ নিতে পারে।

তার উপর কর্ণফুলী রিভারভিউ পার্ককে মডেল করা হচ্ছে পতেঙ্গা সৈকত অঞ্চলের আদলে—যেখানে হাঁটার পথ, বসার জায়গা, আলোকসজ্জা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, খাবার জোন, ছোট খেলার স্থানসহ নানা কিছু থাকবে। নদীর পাশেই সহজ ও আকর্ষণীয় বিনোদনের সুযোগ পাওয়া যাবে।

বৃহৎ সড়ক ও বাঁধ প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বিত উন্নয়ন

এই পর্যটন অঞ্চল তৈরি হচ্ছে এক বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অংশ হিসেবে, যার নাম ‘কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর তীরে ৮.৫ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ’। পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার বেশি।

সড়ক ও বাঁধ দুটিই চট্টগ্রামের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়কটি তৈরি হলে নদীর পাশ ঘেঁষে নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হবে, যানজট কিছুটা কমবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চলাচল সহজ হবে। বাঁধ অংশটি বর্ষায় জলোচ্ছ্বাস ও নদীর ভাঙন থেকে শহরকে সুরক্ষা দেবে।

পর্যটন অঞ্চল তৈরির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২২ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরো প্রকল্পের মধ্যে পর্যটন অংশটি একটি সুন্দর, পরিকল্পিত সাইড ডেভেলপমেন্ট যা পুরো এলাকার জীবনযাত্রা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

পরিবেশ সুরক্ষাকে দেওয়া হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব

কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রামের প্রাণ। দীর্ঘদিন ধরে নদী দখল, বর্জ্য ও দূষণের চাপে জর্জরিত। তাই এই প্রকল্পে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, নদীর সুরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সিডিএ নগর পরিকল্পনা দপ্তর জানিয়েছে, নদীর তীর দখলমুক্ত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নদীকে বাসযোগ্য রাখার কাজও চলবে পাশাপাশি।

এছাড়া সিডিএ শহরের বিভিন্ন জায়গায় পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করছে। লক্ষ্য—মানুষ যাতে শহরের ভেতরেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে, এবং একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি প্রাণবন্ত হয়।

যা হয়েছে আর যা সামনে আসছে

২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি—একনেক—প্রকল্পটি অনুমোদন করে। এরপর ধাপে ধাপে কাজ এগোতে থাকে। ২০১৯ সালের জুনে চাক্তাই খালের মুখে একটি স্লুইস গেট তৈরি করা হয়। এখন চলছে ৮.৫৫ কিলোমিটার সড়ক, বাঁধ ও ১২টি রেগুলেটর নির্মাণের কাজ।

সব মিলিয়ে, কর্ণফুলীর পাশের এই দীর্ঘ এলাকা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণীয় স্পটে পরিণত হতে পারে। একদিকে নদীর সৌন্দর্য, অন্যদিকে সাজানো পরিবেশ—এই অঞ্চলের মানুষ যেমন উপকৃত হবে, তেমনি পুরো শহরেরও একটি নতুন বিনোদন এলাকা যুক্ত হবে।

এটা পরিষ্কার—কর্ণফুলীর তীরে এই নতুন উদ্যোগ কেবল একটি প্রকল্প নয়; চট্টগ্রামকে আরও আধুনিক, প্রাণময় ও বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলার পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Read Previous

টানা অষ্টমবারের মতো ‘বিশ্বের সেরা বিমান সংস্থা’ খেতাব ধরে রাখল এমিরেটস

Read Next

জার্মান দূতাবাসের কঠোর সতর্কবার্তা: ভিসা প্রতারণা ঠেকাতে নতুন নির্দেশনায় কী বলা হলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular