
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে বন্দরে পড়ে থাকা বিলাসবহুল গাড়িগুলোর করুণ পরিণতি চমকে দেওয়ার মতো। প্রায় ৩০ বছর ধরে পড়ে থাকা একাধিক দামি গাড়ি—including সুজুকি, মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, ল্যান্ড ক্রুজার, রেঞ্জ রোভার—আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত, মরিচাধরা লোহায় পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালে আমদানিকৃত একটি সুজুকি প্রাইভেট কার সম্প্রতি নিলামে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২৪.২৫ টাকা কেজি দরে!
এই গাড়িগুলো খালাস না হওয়ার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘অবাস্তব রিজার্ভ মূল্য’। বারবার নিলাম আহ্বান করা হলেও উচ্চ মূল্য নির্ধারণের কারণে কেউ এগিয়ে আসেনি। ১১২টি বিলাসবহুল গাড়ির জন্য সর্বমোট রিজার্ভ মূল্য ধরা হয়েছিল ১৮০ কোটি টাকা, যেখানে বাজার মূল্য ছিল প্রায় ১৭ কোটি টাকা মাত্র। একবার এক মার্সিডিজ গাড়ির জন্য দর উঠেছিল মাত্র ৩৫ হাজার টাকা, অথচ রিজার্ভ মূল্য ছিল কোটি টাকার ওপরে!
সিন্ডিকেট ও নিলামে অনিয়মের অভিযোগ
নিলামের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অনেকে বলছেন, প্রথম নিলামে ইচ্ছাকৃতভাবে দর কমিয়ে দেওয়া হয় যাতে দ্বিতীয় নিলামে কম দামে গাড়ি ক্রয় করা যায়। যদিও কাস্টমস এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (BARVIDA) সহ-সভাপতি মো. হাবিবুল্লাহ জানান, “শুল্কমুক্ত গাড়ির উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে নিলামে অসম্ভব মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে নিলাম ব্যর্থ হচ্ছে, আর গাড়িগুলো ধ্বংস হচ্ছে।”

বন্দরে কনটেইনার জট, বকেয়া পাওনা শত কোটি টাকায়
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার কনটেইনার নিলামযোগ্য পণ্য নিয়ে পড়ে আছে, যা বন্দরের ধারণক্ষমতার প্রায় ১৯ শতাংশ দখল করে আছে। এতে করে পণ্যের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে এবং শিপমেন্ট বিলম্ব হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, কাস্টমস হাউসের কাছ থেকে প্রায় ১৪২ কোটি টাকার বকেয়া পাওনা রয়েছে, যা আদায় না হওয়ায় বন্দর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
আইন সংস্কারের দাবি ও পরামর্শ
বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মহাসচিব জিয়া হাবি আহসান বলেন, “যথাযথ আলোচনার মাধ্যমে নিলামের মূল্য নির্ধারণ ও নীতিমালা সংশোধন না করা হলে জাতীয় রাজস্বের অপচয় ঠেকানো সম্ভব নয়।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সমন্বয়ক কবির চৌধুরী বলেন, “আইনের ফাঁকফোকর ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শুধু রাজস্ব ক্ষতি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ঘটাচ্ছে।”

সমাধানে নতুন উদ্যোগ
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার সাকিব হোসেন জানান, “দ্বিতীয় নিলামে সংরক্ষিত মূল্যের যৌক্তিক হার নির্ধারণ বিষয়ে এনবিআরের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। এতে করে ন্যায্য দর পাওয়ার পাশাপাশি দ্রুত গাড়িগুলো বিক্রি করা সম্ভব হবে।”
এনবিআরের কাস্টমস বিভাগের সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনও জানান, “নিলামের প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করতে আইনি সংস্কারের পাশাপাশি বিকল্প পথ অনুসন্ধান চলছে।”
বিলাসবহুল গাড়িগুলো বন্দরে বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা শুধু রাজস্বের অপচয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদেরও অবমূল্যায়ন। বাস্তবতার নিরিখে রিজার্ভ মূল্য নির্ধারণ ও নিলামের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।



