উপদেষ্টার দায়িত্বে থেকেও এভিয়েশন ব্যবসার উদ্যোগ: শেখ বশিরউদ্দিনকে ঘিরে স্বার্থসংঘাতের বিতর্ক

শেখ বশির উদ্দিন

ছবি : পর্যটন সংবাদ

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : অন্তর্বর্তী সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহণ, পর্যটন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিনকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্বে থাকা অবস্থাতেই তিনি নিজের মালিকানাধীন গ্রুপের মাধ্যমে এভিয়েশন ব্যবসায় প্রবেশের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং সেই লক্ষ্যে ট্রেড লাইসেন্সও সংগ্রহ করেছেন। বিষয়টি সামনে আসার পর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং নৈতিকতার প্রশ্নে আলোচনার ঝড় উঠেছে।

শেখ বশিরউদ্দিন আকিজ বশির গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল তার ওপর বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও অর্পণ করা হয়। মন্ত্রী সমমর্যাদার এই পদে থেকে একই খাতে ব্যবসায়িক উদ্যোগ নেওয়াকে অনেকেই স্পষ্ট স্বার্থসংঘাত হিসেবে দেখছেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২ মার্চ শেখ বশিরউদ্দিনের মালিকানাধীন আকিজ বশির গ্রুপ বেবিচকের চেয়ারম্যান বরাবর একটি অভিপ্রায়পত্র জমা দেয়। সেখানে হেলিকপ্টারভিত্তিক বি-২ ক্যাটাগরির একটি এয়ারলাইন্স চালুর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রস্তাবিত এই এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে দেশীয় রুটে যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের পাশাপাশি সিডিউল ও নন-সিডিউল ফ্লাইট পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
অভিপ্রায়পত্রে আরও জানানো হয়, গ্রুপটি আগে থেকেই সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স লিমিটেডের মাধ্যমে হেলিকপ্টার পরিচালনার অভিজ্ঞতা রাখে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ‘আকিজ বশির এভিয়েশন লিমিটেড’ নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ২০২৫ সালের ১১ মার্চ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়। লাইসেন্সে ব্যবসার ধরন হিসেবে উল্লেখ আছে—আমদানি, এভিয়েশন সার্ভিস ও রপ্তানি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই ট্রেড লাইসেন্সে সরাসরি শেখ বশিরউদ্দিনের নাম ও ছবি সংযুক্ত রয়েছে।
লাইসেন্স পাওয়ার পর এভিয়েশন ব্যবসার নিয়মিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী বেবিচকের ফ্লাইট সেফটি রেগুলেশন (এফএসআর) উইংয়ের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বেবিচক সূত্র জানায়, ওই বৈঠকে আকিজ বশির এভিয়েশনের মালিক হিসেবে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন স্বয়ং শেখ বশিরউদ্দিন। বৈঠকের পর ১৮ মার্চ বেবিচক চেয়ারম্যান বরাবর এভিয়েশন ব্যবসার জন্য অনাপত্তিপত্র (এনওসি) চেয়ে আবেদন করা হয়। বর্তমানে সেই আবেদনটি চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। লাইসেন্স প্রদান, এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (এওসি), নিরাপত্তা অনুমোদন, রুট পারমিশন—সবকিছুই সরাসরি বেবিচক ও বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টার নিজের প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আবেদন একই কাঠামোর ভেতর বিচারাধীন থাকা স্পষ্ট স্বার্থসংঘাতের উদাহরণ।

আইন বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টিকে সংবিধানবিরোধী বলে মনে করছেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিকের মতে, সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদে মন্ত্রী ও মন্ত্রীসম মর্যাদার ব্যক্তিদের জন্য লাভজনক কোনো পদে থাকা বা ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার ওপর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া মানেই ব্যবসার প্রস্তুতি, যা সংবিধানের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ব্যক্তিগত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়া সংবিধানের নীতি, শপথবিধি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বার্থসংঘাত প্রতিরোধ নীতিমালার পরিপন্থী। বিশেষ করে যেই মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তরের কাছে লাইসেন্স চাওয়া হচ্ছে, সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানও বিষয়টিকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের হাতে থাকা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা করপোরেট বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের ঝুঁকি নতুন নয়। ফলে সুশাসনের প্রত্যাশা নিয়ে যারা আশাবাদী ছিলেন, তাদের হতাশা বাড়ছে।

তবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শেখ বশিরউদ্দিন বলেছেন, উপদেষ্টা হওয়ার বহু আগেই তিনি হেলিকপ্টারের মালিক ছিলেন এবং গত ১৪ বছর ধরে সেই হেলিকপ্টার সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স পরিচালনা করে আসছে। তার দাবি, কোম্পানি গঠনের সিদ্ধান্তও আগেই নেওয়া ছিল। সমালোচনা বা অভিযোগকে তিনি বিদ্বেষমূলক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

সব মিলিয়ে, উপদেষ্টার দায়িত্বে থেকেও এভিয়েশন ব্যবসার লাইসেন্স নেওয়ার এই উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রশাসনিক নৈতিকতা, সংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। এই বিষয়ে সরকার কী অবস্থান নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়

Read Previous

বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মুখে বাংলাদেশের বিমান চলাচল

Read Next

তাম চুক–ভ্যান লংকে বিশ্ব ঐতিহ্যের পথে নিতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি, বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া জোরদার নিন বিনে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular