অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির প্রতারণা থামছেই না


পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : অনলাইন টিকিট বুকিং সেক্টরে আবারও বড় ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক গ্রাহক ও সাব-এজেন্টের লাখ লাখ টাকা নিয়ে হুট করে সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কয়েক হাজার যাত্রী এবং প্রায় ১০-১২ হাজার সাব-এজেন্ট।

এর আগেও ফ্লাইট এক্সপার্ট, ২৪টিকিট ডটকম, লেটস ফ্লাইসহ বেশ কয়েকটি ওটিএ একই পদ্ধতিতে বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা তুলে উধাও হয়েছে। অথচ এখনো পর্যন্ত অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর (ওটিএ) জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি না থাকায় প্রতারকচক্র বারবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

অফিসে তালা, ফোন বন্ধ — গ্রাহকরা পথে

বুধবার থেকে ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, ফেসবুক পেজ এবং কাস্টমার কেয়ার সম্পূর্ণ অচল। ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তাদের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অফিস বন্ধ, বাইরে শত শত গ্রাহক ও সাব-এজেন্ট টাকা ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে।

জসিম উদ্দিন, এক ভুক্তভোগী জানান, “অনলাইনে পুরো টাকা পরিশোধ করে টিকিট কেটেছি। আজ ফ্লাইট ছিল, কিন্তু সকালে ফোন আর অফিস—কিছুই চালু নেই।”

স্বপ্ন গ্লোবাল নামের সাব-এজেন্সির শৈশব মাহমুদ অভিযোগ করেন, “সাড়ে ৪ লাখ টাকার টিকিট ইস্যু করেছি, পুরো টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে গেছে। এখন সব টিকিট বাতিল দেখাচ্ছে। আমরা গ্রাহকদের কী বলব?”

জনপ্রিয়তা থেকে ভরাডুবি — ‘ফ্লাই ফার লেডিস’ আস্থার সংকটে

ফ্লাই ফারের নারী ভ্রমণ ব্র্যান্ড ‘ফ্লাই ফার লেডিস’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বিশেষ ছাড়, পজিটিভ রিভিউ আর ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বড় বাজার তৈরি করেছিল তারা।

আলেয়া আফরিন, দুবাই ট্যুরের গ্রাহক বলেন, “তাদের বিজ্ঞাপন ও রিভিউ দেখে আস্থা পেয়েছিলাম। সাড়ে তিন লাখ টাকা দেওয়ার পর বলেছিল ভ্রমণের সাত দিন আগে টিকিট দেবে। এখন কেউ ফোন ধরছে না।”

নীতিমালা নেই, তদারকি নেই — জালিয়াতি থামবে কীভাবে?

অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অফ বাংলাদেশ (আটাব)-এর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম আরেফ বলেন,
“ওটিএরা শুধু টিকিট বিক্রি করে না, মানি ম্যানেজমেন্টের নামে বাজার থেকে টাকা তোলে। পরে সে টাকা বিদেশে পাচার হয়। আমরা বহুবার নীতিমালা চাইলোও তা হয়নি—কেন হয়নি, সেটিই বড় প্রশ্ন।”

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
“প্রতারণা হচ্ছে, মানুষ পথে বসছে—তবুও কার্যকর নীতিমালা নেই। এটি রাষ্ট্রীয় অবহেলা ছাড়া কিছু নয়। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষকে দ্রুত যৌথভাবে এ খাতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।”

আগের ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নেয়নি কেউ

প্রতিষ্ঠানবছরআত্মসাৎকৃত অর্থবর্তমান অবস্থা
ফ্লাইট এক্সপার্ট২০২৫অজানা, সম্ভাব্য কোটি টাকামালিক বিদেশে
২৪টিকিট ডটকম২০২১প্রায় ৪.৪৪ কোটি টাকাউধাও
লেটস ফ্লাই২০২৩প্রায় ১০ কোটি টাকাকোনো ক্ষতিপূরণ নেই
ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল২০২৫হাজারো গ্রাহক প্রতারিতঅফিস বন্ধ, ফোন বন্ধ

এখনই যা জরুরি

  • ওটিএ নীতিমালা প্রণয়ন
  • অনলাইন টিকিট বিক্রয়ে সিকিউরিটি ডিপোজিট ও লাইসেন্সিং বাধ্যতামূলক করা
  • প্রতারক মালিকদের দেশত্যাগ তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা
  • ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক ও সাব-এজেন্টদের জন্য কমপেনসেশন স্কিম
  • সাইবার ক্রাইম ইউনিটে স্পেশাল সেল গঠন করে ওটিএ মনিটরিং

Read Previous

শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো সেকশনের আগুন নিয়ন্ত্রণে, তদন্তের প্রস্তুতি ফায়ার সার্ভিসের

Read Next

আফগানিস্তান–পাকিস্তান সীমান্ত উত্তাপ কমাতে কাতারের মধ্যস্থতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular