ফ্লাইটে উঠার সময় যিনি আপনাকে লাগেজ রাখতে সহায়তা করে আপনার জন্য সংরক্ষিত আসনটি আপনাকে দেখিয়ে দেয় এবং ফ্লাইট ছাড়ার পর মধ্য আকাশে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে যিনি স্মিত হেসে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেন, স্যার আপনার সিট বেল্ট বাঁধতে হবে। এর কিছুক্ষণ পর আরেকজন এসে বলেন কিভাবে বিপদ হলে কি কররে হবে তাছাড়া আপনার আথিতেয়তায় আপনার কি চাই চা কফি, কিংবা অন্য কিছু? এরপর যারা খাবার দেবেন, আবার সুনিপুণভাবে সেগুলো গুছিয়ে নিয়ে যাবেন, আপনার ঘুম পাড়ানোর জন্য পরিবেশ নিশ্চিত করবেন, সেটাই কেবিন ক্রুদের পেশা এবং তারাই হচ্ছে কেবিন ক্রু। যারা উড্ডয়ন থেকে অবতরণ পর্যন্ত সময়টুকু সার্বক্ষণিক সেবা শুশ্রূষা নিশ্চিত করেন। তাদের ছোটখাটো অসুখ করলে কিংবা ঘরে অসুস্থ স্বজন রেখে আসলেও আপনার সামনে হাসিমুখে দাঁড়াতে হয়। এটাই তাদের মূল দায়িত্ব এবং এটাই তাদের ব্রত। বিশ্বব্যাপী এটাকে বলা হয় ‘গ্লামার জব ইন দ্য স্কাই‘।
আজ শনিবার ৩১ মে আন্তর্জাতিক কেবিন ক্রু দিবস। কানাডা ইউনিয়নের উদ্যোগে ২০১৫ সালে বিশ্বে প্রথম কেবিন ক্রু দিবস পালন করা হয়। প্রথম ৪৮০ জন কেবিন ক্রু নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি উদ্যাপন করা হয়।
সুশিক্ষিত ও আলট্রা মডার্ন তরুণ-তরুণীদের পছন্দের শীর্ষে থাকা এই পেশার প্রতি সাধারণ মানুষের কৌতূহলও লক্ষ্যণীয়।একজন ভ্রমণকারীর ভ্রমণকে সর্ব বিবেচনায় নিরাপদ করে তোলাই কেবিন ক্রুদের মূল কর্তব্য। প্রতিটি সফল উড্ডয়ন ও অবতরণ একজন কেবিন ক্রুকে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবীতে ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়িক ভ্রমণ, রাজনৈতিক ভ্রমণ, চিকিৎসার জন্য ভ্রমণ, আনন্দ ভ্রমণ ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে আকাশযাত্রা বেড়েই চলেছে। শিশু থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ সবাই থাকেন কেবিন ক্রুদের ভ্রমণসঙ্গী। কেবিন ক্রুদের বলা হয়, ফার্স্ট রেসপনডার।

এছাড়া ও কেবিন ক্রুদের হার্টঅ্যাটাক, হাইপোক্সিয়া, হাইপারভেন্টিলেশন, হাইপোগ্লাসেমিয়া, হাইপারগ্লোসিমায়, চকিং, নোজ ব্লিডিং এবং প্রেগন্যান্ট ডেলিভারির দায়িত্বও পালন করতে হয় অনেক ক্ষেত্রে। পেশাদারিত্বের এই দক্ষতায় সত্যিকার অর্থেই আকাশ হয়ে উঠুক শান্তির নীড়। বিমান আকাশে ওড়ার একঘণ্টা আগে ক্যাপ্টেন কেবিন ক্রুদের আবহাওয়া ও অন্যান্য বিষয় সংক্রান্ত তথ্য জানিয়ে দেয়। এছাড়া পরিচ্ছন্নতা, সি পকেট সংক্রান্ত তথ্য, খাবার-দাবারের সরঞ্জাম পৌঁছানো, জরুরি ইক্যুইপমেন্ট, ফার্স্ট এইড প্রভৃতি ঠিকঠাক আছে কিনা এসব কেবিন ক্রুদের দেখে নিতে হয়।
বিমানে ওঠার পর যাত্রীদের টিকিট মিলিয়ে দেখা, কেবিন লাগেজ সিটে পৌঁছাতে সহায়তা করা, যাত্রীদের সিট দেখিয়ে দেওয়া এবং বিমান আকাশে ওড়ার আগে যাত্রীদের সিট বেল্ট লাগাতে বলাও কেবিন ক্রুদের কাজের পর্যায়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, বিমান ওঠানামা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় পাইলটের হয় কেবিন ক্রুদের বলতে হয়। এই পেশার যে লাইফ স্টাইল এবং রোমাঞ্চকর অনুভূতি তা সহজেই তরুণদের আকর্ষণ করে।
কেবিন ক্রু যখন যে দেশে যায় তার সে দেশে থাকা খাওয়ার খরচ ও ফ্লাইং আওয়ার ভিত্তিতে ভাতা পেয়ে থাকে। অন্যান্য পেশার চাকরির মতো এই পেশায় রয়েছে প্রভিডেন্ট ফান্ড, মেডিক্যাল বেনিফিট, আবাসনসহ বিভিন্ন সুবিধাবলি। কেবিন ক্রু হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি বিষয়। এজন্য বিভিন্ন সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ নিয়ে বিমানে ক্রু নিয়োগ দেন।
শুধু বাংলাদেশ নয়- বিশ্বব্যাপীই কেবিন ক্রু পেশাকে দেখা হয় বিশেষ মর্যাদাকর ও চ্যালেঞ্জিং হিসেবে। পেশাটি অনেক রোমাঞ্চকর ও জৌলুসপূর্ণ মনে হলেও এর অন্তরালে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ ও কঠিন বাস্তবতা। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে চল্লিশ হাজার ফুট ওপরে ভাসমান শত শত যাত্রীর দীর্ঘ আকাশ ভ্রমণের ঘরের সেবা নিশ্চিত করার প্রধান দায়-দায়িত্ব যাদের ওপর নির্ভর করে- তাদের জীবন কতটা বৈচিত্র্যময় সে কৌতূহল চিরকালের। যাত্রী সাধারণের ইচ্ছামতো সেবাই যাদের ব্রত তাদের সুখ-দুঃখের জীবনও সাধারণ মানুষের মতোই।
তাদের রয়েছে সাধারণ মানুষের মতোই জীবনাচরণ। আকাশ পথে যে পেশার মানুষ যাত্রীদের জীবন নিরাপত্তার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাতদিন সেবা দিয়ে যান- তারা হলেন কেবিন ক্রু। অনেক শ্রম-ঘাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা চড়াই-উৎরাই পার করেই এ ধরনের চ্যালেঞ্জিং ও সম্ভাবনাময় পেশায় ক্যারিয়ার হিসেবে একজন কেবিন ক্রু পা বাড়ায়।
স্মার্টনেস ও ভালো ইংরেজি বলার দক্ষতা আপনাকে এগিয়ে রাখবে এয়ার হোস্টেজ বা কেবিন ক্রু হওয়ার প্রতিযোগিতায়। কেবিন ক্রু বা এয়ার হোস্টেজ হতে চাইলে অধিক সুন্দর বা সুন্দরী হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যোগ্যতাই হলো আসল কথা। যেকোনো ধর্মের ছেলে মেয়েরা আবেদন করতে পারবে। প্রার্থীকে পরিচ্ছন্ন রুচি, মিষ্টি হাসি, অনেকক্ষণ এককভাবে কাজ করার ক্ষমতা, বিরক্তিকর পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকা, উপস্থিত বুদ্ধি-জ্ঞান, ধৈর্য ও সহনশীলতা, বিপদে সাবলীল মানসিকতা ও সবার সঙ্গে আন্তরিকতার সাথে মিশতে পারার ক্ষমতা এ চাকরিতে সফলতা এনে দেবে। আমাদের দেশের শত শত ছেলেমেয়ে প্রতিদিন উড়ে চলেছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে।



