১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাচার করা অর্থে বিদেশে মেঘনা গ্রুপের বিনিয়োগ

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল এবং তার পরিবারের সদস্যরা বড় অঙ্কের অর্থ পাচার করেছেন। পাচারের অর্থ দিয়ে তারা কোনো রাখঢাক ছাড়াই বিনিয়োগ করেছেন। খুলেছেন ব্যবসা, কিনেছেন জাহাজ, গড়ে তুলেছেন বাড়ি, ভিলা, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা।

বিদেশে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নেওয়ার আইনি বিধান থাকলেও তারা তার তোয়াক্কা করেননি।

মেঘনা গ্রুপের অর্থ পাচার ও বিদেশে অবৈধভাবে বিনিয়োগের বিষয়গুলো তদন্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সিআইডি।

পাচারের অর্থ দিয়ে কোন দেশে কোন খাতে কত অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার তালিকা করা হচ্ছে। বিনিয়োগের অর্থ কোন উৎস থেকে নেওয়া হয়েছে, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এরই মধ্যে মেঘনা গ্রুপের মালিক ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে একাধিক লিখিত অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। এসব অভিযোগ সামনে রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে।

অভিযোগ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এমজিআইয়ের সিঙ্গাপুরে একাধিক প্রতিষ্ঠান আছে। ২০১৮ সাল থেকে ওই সব প্রতিষ্ঠান শুরু করা হলেও বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়নি। মেঘনা গ্রুপের দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ রয়েছে, ‘মেঘনা ট্রেডার’ ও ‘মেঘনা প্রাইড’। এসব জাহাজ সিঙ্গাপুর ইউনিটের অধীনে কাজ করে। জাহাজ দুটি গড়ে প্রতিবছর ২৩৭ মিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে। এমজিআই কোম্পানির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল এবং তার তিন কন্যা এসব সম্পদের অংশীদার। মোস্তফা কামাল, তার কন্যাদের এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সিঙ্গাপুরের জাতীয় নিবন্ধনপত্র আছে। তারা সিঙ্গাপুরের নাগরিক বলেও অভিযোগপত্রে আছে।

তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পাচারের ৮০ শতাংশই ব্যাংকিং চ্যানেলে মিথ্যা তথ্যে পাচার করেছে। বিনিয়োগ করা অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না এবং বিনা শর্তে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, এমন সব দেশ বা শহরেই মেঘনা গ্রুপের বেশির ভাগ অর্থ পাচার করা হয়েছে। সেখানে কোনো ধরনের গোপনীয়তা ছাড়াই মেঘনা গ্রুপ কোম্পানি খুলে পাচার করা অর্থ বৈধ (সাদা) বলে স্বীকৃতি আদায় করেছে। এরপর তা সেখানেই যে কোম্পানি খুলেছে, সেই কোম্পানির ব্যবসা থেকে মুনাফা দেখিয়ে সেখান থেকেও পাচারের অর্থ অন্য দেশে নিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে যেসব ব্যবসা খোলা হয়েছে সেগুলো হলো- জাহাজ, হোটেল, ভিলা, বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, বাণিজ্যিক স্থাপনা, দোকান ইত্যাদি। কেনা হয়েছে মোটা অঙ্কের সম্পদও। ব্যবসায় মুনাফার পরও কোনো অর্থ প্রতিষ্ঠানটি দেশে আনেনি বলে তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়।

ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে দুদকের একাধিক অনুসন্ধানকারী টিম কিছুদিন ধরেই কাজ করছে। এর মধ্যে ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অন্যতম। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, মেঘনা গ্রুপের কর্ণধার মোস্তফা কামাল ২০০০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ কোটি ৩৩ লাখ ২১ হাজার ১২৬ টাকা শুল্কায়নযোগ্য মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। তবে এ সময়ে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) অনুযায়ী ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৪৮ হাজার ৩৬৮ কোটি ৪২ লাখ ৪২ হাজার ৩১১ টাকা। সে হিসাবে আমদানির আড়ালে অতিরিক্ত সুবিধা নিয়ে গোপনে ৭৯ হাজার ৭৬২ কোটি ৯০ লাখ ৭৮ হাজার ৮১৫ টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে।

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। আমদানি-রপ্তানিতে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, তার মালিক এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে সরকারের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পাচার করা অর্থ এবং অনুমোদন ছাড়া বিদেশের ব্যবসা থেকে আয় করা অর্থ উদ্ধারে জোর দেওয়া হয়েছে। পাচারের অর্থ দিয়ে বিদেশে সম্পদ ক্রয়কারীদের অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতেও সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আটঘাট বেঁধে নেমেছে। এরই ধারাবাহিকতায় এমজিআইয়ের বিদেশে বিনিয়োগের অর্থ আইন মেনে নিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নির্দেশে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, তার স্ত্রী ও গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান বিউটি আক্তার এবং তাদের সন্তানদের ৩১টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট ৩০ দিনের জন্য ফ্রিজ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সংবাদ কর্মীদের বলেন, দেশ থেকে অনেকেই অর্থ পাচার করে সেই সব দেশে বা শহরে নিয়ে গেছে, যেখানে অর্থের উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা হয় না। সেখানে কোম্পানি খুলে পাচার করা অর্থ হোয়াইট (সাদা) করে অন্য দেশে নিয়ে বিনিয়োগ করে ব্যবসা করছে। এ কাজে দেশের অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠান জড়িত। এরা মুনাফার একটি অর্থও দেশে আনেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থ পাচার করেছে। বিদেশে কোনো ধরনের গোপনীয়তা ছাড়াই বিনিয়োগ করে ব্যবসা করছে, সম্পদ করেছে।

অর্থ পাচার নিয়ে এনবিআরের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা যায়, মেঘনা গ্রুপ পাচারের অর্থে বিদেশে বেশি বিনিয়োগ করেছে সিঙ্গাপুর, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, দুবাই, ভারত, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও হংকংয়ে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনুমোদন নেওয়ার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করে। মেঘনা গ্রুপের বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদন নেওয়ার কোনো তথ্য নেই।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ বলেন, বিগত সরকারের ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৮ উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে শ্বেতপত্রে। বিদেশে যারা বিনিয়োগ করেছে, সম্পদ করেছে এর প্রায় সব অর্থ দেশ থেকে পাচার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন তদন্তে উঠে আসছে। এসব অর্থ দিয়ে বাংলাদেশ অনেকগুলো জাতীয় বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারত। অনেক বছর সরকার ব্যয় মেটাতে পারত। বিষয়গুলো তদন্ত করে শাস্তি দেওয়া জরুরি। অর্থ পাচার ও বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা নিতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগিয়েছিলেন মোস্তফা কামাল। মেঘনা নদীর জায়গা দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, অবৈধ দখলে নদী ভরাট করে নষ্ট করেছেন নদীর গতিপথ। বেসরকারি ৯টি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। যার বেশির ভাগই ফেরত আসার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ অবস্থায় গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর মেঘনা গ্রুপের নানাবিধ দুর্নীতির বিষয়ে দুদকে একের পর এক অভিযোগ আসতে থাকে।

মোস্তফা কামাল ও তার প্রতিষ্ঠান শিশুখাদ্য বেশি দামে আমদানি করে শুল্কায়নের সময় কম মূল্য দেখিয়ে একদিকে সরকারের শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে সেই টাকা পাচার করেছেন মর্মেও দুদকে একাধিক অভিযোগ আসে। এসব দুর্নীতি ও অপকর্মের শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে আওয়ামী লীগের কর্মীর মতো কাজ করেছেন তিনি। সে সময় ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও বাধা সৃষ্টি করেন।

তদন্ত থেকে জানা যায়, ২০১৩ সাল থেকে গ্রুপটির আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের প্রবণতা বেড়ে যায়। তবে করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে আমদানি কমে যাওয়ায় সে বছর স্বাভাবিকভাবে এর পরিমাণ কমে। ২০২০ সালে এলসি ও শুল্কায়নযোগ্য মূল্যের পার্থক্য ছিল ২৬৪ কোটি টাকা। অথচ এর আগের তিন বছর এর পরিমাণ ১ হাজার ২০০ কোটি থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে গড় শুল্কহার সাড়ে ২৯ শতাংশ। হুন্ডিতে দায় শোধ করায় ৩ থেকে ৫ শতাংশে বেশি খরচ হয় আমদানিকারকের। ফলে সাড়ে ২৯ শতাংশ শুল্ক ফাঁকি দিয়ে হুন্ডির পেছনে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ খরচ হলেও রাষ্ট্রকে একটি বড় অঙ্কের টাকা ফাঁকি দেওয়া হয়।

মোস্তফা কামালের এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ৬০ থেকে ৭০টি নৌযান ও প্রায় ১ হাজার ২০০ মোটরযানের বিপরীতে বিমা পলিসি বাধ্যতামূলক থাকলেও পলিসির ৩০০ কোটি টাকা তিনি আত্মসাৎ করেন। ব্যাংক কমিশনের ৬৩৮ কোটি ১০ লাখ ৩২ হাজার ৬৩০ টাকা এবং বিমা পলিসির বিপরীতে ৪ শতাংশ স্ট্যাম্প ডিউটির ২৫ কোটি ৫২ লাখ ৪১ হাজার ৩০৫ টাকা পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করে মেঘনা গ্রুপ। ভ্যাট হিসেবে ব্যাংক কমিশনের ১৫ শতাংশ টাকা পাওয়ার কথা রাষ্ট্রের। ভ্যাটের অন্তত ৯৫ কোটি ৭১ লাখ ৫৪ হাজার ৯৮৪ টাকা লোপাট করেছে গ্রুপটি। রাষ্ট্রের ভ্যাট ও স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ ৪০৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে।

Read Previous

দেশের বিভিন্ন স্থানে শিলা বৃষ্টির সম্ভাবনা

Read Next

পরিকল্পনা আর দূরদর্শিতার অভাবে বিমান ও পর্যটন খাতের বাজেট ছোট হচ্ছে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular