
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের ভৌগোলিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক স্থাপনের পথে এগিয়ে চলেছে দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ নির্ধারণের কাজ। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তাজিংডং, কেওক্রাডং এবং সাকা হাফংয়ের মধ্যে কোনটি দেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ—এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে সরকারিভাবে প্রথমবারের মতো বান্দরবান জেলার দুর্গম রুমা ও থানচি উপজেলায় বিস্তৃত জরিপ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তরের (সার্ভে অব বাংলাদেশ) একটি অভিজ্ঞ দল গত ৪ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন পাহাড়ের উচ্চতা পরিমাপ করেছে। সব তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই শেষে আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের নাম ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন জরিপ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাতে বান্দরবানের সার্কিট হাউসের সভাকক্ষে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানান সার্ভে অব বাংলাদেশের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুর-এ-আলম মোহাম্মদ যোবায়ের সারোয়ার। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ নির্ধারণে এটি প্রথম সরকারি উদ্যোগ। আমরা আধুনিক জিওডেটিক পদ্ধতি এবং উন্নত গ্লোবাল ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (জিএনএসএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেন্টিমিটার স্তরের নির্ভুলতায় উচ্চতা, অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করেছি। এর মাধ্যমে দেশের ভৌগোলিক মানচিত্র আরও নির্ভরযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত হবে।”
জরিপ দলের সদস্যরা রুমা, থানচি, রেমাক্রি ও তিন্দুসহ বান্দরবানের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় সরাসরি পরিদর্শন করে কাজ করেছেন। ডুয়াল ফ্রিকোয়েন্সি রিসিভার, টোটাল স্টেশন, লেভেল মেশিনসহ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পাহাড়গুলোর চূড়ার গড় সমুদ্রতল থেকে উচ্চতা মাপা হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল যোবায়ের সারোয়ার আরও জানান, “আমরা শুধু উচ্চতাই নয়, প্রতিটি শৃঙ্গের সঠিক ভৌগোলিক অবস্থানও নথিভুক্ত করেছি। এ কাজে কোনো ধরনের অনুমান বা পুরনো তথ্যের উপর নির্ভর করা হয়নি। সবকিছু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যাচাই করা হয়েছে।” তিনি সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, সর্বোচ্চ শৃঙ্গটি বান্দরবান জেলার যেকোনো স্থানে হতে পারে, তবে এখনই আনুষ্ঠানিক নাম প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
এই জরিপ কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্বতশৃঙ্গ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের চিরসমাপ্তি ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতদিন বিভিন্ন বেসরকারি সূত্র এবং পর্যটকদের মধ্যে তাজিংডং (১২৮০ মিটার বলে দাবি), কেওক্রাডং (১২৩০ মিটার) এবং সাকা হাফংকে সর্বোচ্চ বলে দাবি করা হতো। কিন্তু কোনো সরকারি নির্ভুল তথ্য না থাকায় বিষয়টি ছিল বিতর্কিত। বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তরের এই উদ্যোগ দেশের ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতে পর্যটন উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বড় ভূমিকা রাখবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন উপ-পরিচালক (জরিপ) দেবাশীষ সরকার। তিনি জানান, জরিপ দলের সদস্যরা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য পরিবেশে কাজ করেছেন। দুর্গম পথ, আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়েছে। বান্দরবান প্রেস ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এন এ জাকিরসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা জরিপ কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বলেন, এই তথ্য প্রকাশের পর বান্দরবানের পর্যটন শিল্প আরও বেগবান হবে। পর্যটকরা এখন সরকারি সিলমোহরযুক্ত সর্বোচ্চ শৃঙ্গ দেখতে উৎসাহিত হবেন।
জরিপ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হয়েছে। উচ্চতা নির্ধারণে কোনো ধরনের ত্রুটি যাতে না থাকে সেজন্য একাধিকবার যাচাই করা হয়েছে। প্রযুক্তির সাহায্যে গড় সমুদ্রতল থেকে সঠিক উচ্চতা মাপা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের মানচিত্র আপডেট করতে সহায়ক হবে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জরিপের সব তথ্য এখন কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে দেশবাসী জানতে পারবে তাদের দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের প্রকৃত নাম ও অবস্থান।
এই উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিচয় আরও স্পষ্ট হবে। পাহাড়ি অঞ্চলের উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পর্যটনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল যোবায়ের সারোয়ারের নেতৃত্বে পরিচালিত এই জরিপ কার্যক্রম শুধু একটি প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং জাতীয় গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, এই তথ্য সবার কাছে সহজলভ্য হোক। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম জানবে তাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক চিত্র।”
সার্বিকভাবে, এই জরিপের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রমাণ করল যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সফলভাবে কাজ সম্পন্ন করে জরিপ দল দেশের জন্য একটি অমূল্য উপহার দিয়েছে। এখন অপেক্ষা শুধু মে মাসের প্রথম সপ্তাহের—যখন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাতি জানবে তার সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম। এই ঘোষণা শুধু একটি সংবাদ নয়, বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা।



