
ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দীর্ঘদিনের অদক্ষতা দূর করে আধুনিক ও সক্ষম একটি বিমানবহর গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতোমধ্যে ১৪টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের নীতিগত অনুমোদন দিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরের সরবরাহ ব্যবধান পূরণে এয়ারবাস বিমান লিজ নেওয়ার পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। এই দ্বৈত কৌশলের মাধ্যমে দেশের আকাশপথে যাত্রী চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত এভিয়েশন এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে… এখন শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করা বাকি… আমরা এখন নীতিগতভাবে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান ও জ্বালানি সম্পদ সংগ্রহের এই উদ্যোগ ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে প্রতিমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর বোয়িংয়ের প্রস্তাবটি আরেকবার পর্যালোচনা করা হতে পারে। এতে করে স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে বলে তিনি আশাবাদী।
প্রস্তাবিত এই অর্ডারের আনুমানিক তালিকা মূল্য প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে প্রশস্ত দেহের বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবং সংকীর্ণ দেহের ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের মিশ্রণ থাকবে। এই বিমানগুলো আগামী দশকে দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক রুট যেমন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক রুটেও সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আন্তর্জাতিক রুটে মাত্র ১৪টি বিমান সক্রিয় রয়েছে। অথচ ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা এবং পরিকল্পিত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি আধুনিক বিমান। এই ঘাটতি পূরণে পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই সরকার তাৎক্ষণিকভাবে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে এয়ারবাস বিমান লিজ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত জানান, “এই সময়ে কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আমরা আগামী পাঁচ বছরের জন্য বিমান লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করছি, বিশেষত ড্রাই লিজের মাধ্যমে।” এই লিজ চুক্তির মাধ্যমে বিমানের পরিচালনগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিমানবহরের গঠনে বৈচিত্র্য আনা হবে। বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে বিমানটিকে আরও নমনীয় ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা হবে। এই কৌশলগত পদক্ষেপ শুধু যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন করবে না, বরং জ্বালানি খরচ কমিয়ে পরিচালনগত দক্ষতাও বাড়াবে।
বিমানের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায়ও ব্যাপক গতি এসেছে। দীর্ঘদিনের অদক্ষতা, জনবলের ঘাটতি এবং অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে সরকার বিমানের পুরো পরিচালন কাঠামোর ব্যাপক পর্যালোচনা শুরু করেছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে চলমান। এতে করে একটি আরও কার্যকরী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, “কাঠামোগত সংস্কার, বিমানবহর সম্প্রসারণ এবং পরিষেবার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে বিমানকে একটি আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইনে রূপান্তরিত করাই সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য।”
এদিকে আসন্ন হজ কার্যক্রম নিয়েও প্রস্তুতি সম্পূর্ণ। তীর্থযাত্রীদের জন্য ফ্লাইটগুলো নির্বিঘ্ন ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল মোতায়েন করা হয়েছে। এই উদ্যোগগুলো শুধু যাত্রীদের সুবিধা নিশ্চিত করবে না, বরং দেশের পর্যটন শিল্পকেও নতুন গতি দেবে। বিমানের আধুনিকীকরণের ফলে বাংলাদেশের আকাশপথে আন্তর্জাতিক যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, যা অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
সার্বিকভাবে এই পরিকল্পনা বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতকে এক নতুন যুগে নিয়ে যাবে। বোয়িং ক্রয়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এয়ারবাস লিজের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে সরকার একটি সুষম ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় পতাকাবাহী এই সংস্থা দেশের গৌরবের প্রতীক হয়ে উঠবে।
এই সংবাদের প্রেক্ষিতে এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন যে, নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরও এই প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। কারণ এটি শুধু একটি এয়ারলাইন্সের উন্নয়ন নয়, বরং দেশেরঅর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনার এক বৃহত্তর রূপরেখা। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এই রূপান্তর যাত্রা সফল হলে বাংলাদেশ বিশ্বের এভিয়েশন মানচিত্রে একটি উজ্জ্বল স্থান করে নিতে পারবে।



