পর্যটন খাতে খাদ্য অপচয় রোধে জাতিসংঘের নতুন বৈশ্বিক উদ্যোগ ‘রেসিপি অফ চেঞ্জ’

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : আন্তর্জাতিক বর্জ্যমুক্ত দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ পর্যটন সংস্থা (ইউএন ট্যুরিজম) এবং জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) যৌথভাবে ‘রেসিপি অফ চেঞ্জ’ নামে একটি ব্যাপক বৈশ্বিক উদ্যোগ চালু করেছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো পর্যটন শিল্পে খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা এবং টেকসই অনুশীলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৬০ কোটিরও বেশি অতিথিকে সেবা প্রদানকারী এই খাতের প্রধান খেলোয়াড়দের একত্রিত করে উদ্যোগটি খাদ্য অপচয়ের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করতে চলেছে।

খাদ্য অপচয় বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুতর পরিবেশগত সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি নষ্ট হয়ে যায়, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ১০ শতাংশের জন্য দায়ী। একই সঙ্গে প্রতিদিন ২৩০ কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন। পর্যটন খাতে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁও বিমানবন্দরের খাবার পরিবেশনে এই অপচয়ের হার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এই প্রেক্ষাপটে ‘রেসিপি অফ চেঞ্জ’ উদ্যোগটি শুধু পরিবেশ রক্ষায় নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল একটি সমাধান হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

উদ্যোগটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ১২.৩-এর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। এই লক্ষ্য অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। ‘রেসিপি অফ চেঞ্জ’-এর আওতায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদেরকার্যক্রমে খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ নিয়মিত পরিমাপ করবে, অপারেশনাল পরিবর্তন আনবে এবং কর্মী ও অতিথিদের আচরণগত পরিবর্তন ঘটাতে উৎসাহিত করবে। এর মধ্যে রয়েছে মেন্যু পুনর্গঠন, পরিবেশনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, অবশিষ্ট খাবারের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং অতিথিদের সচেতনতা বৃদ্ধি।

এই উদ্যোগে ইতোমধ্যে যোগ দিয়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় হোটেল ও পর্যটন গ্রুপগুলো। হিলটন, অ্যাকর, টিইউআই গ্রুপ, র‍্যাডিসন হোটেল গ্রুপ, আইবেরোস্টার, মেলিয়া, ক্লাব মেড, সিক্স সেন্সেসসহ মোট ১৪টি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিচ্ছে। এসব সংস্থা সম্মিলিতভাবেবছরে ৫৬.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রাজস্ব আয় করে এবং প্রায় ৬০ কোটি অতিথিকে সেবা দেয়। এই বিশাল স্কেলের কারণে উদ্যোগটির প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইউএন ট্যুরিজমের সেক্রেটারি-জেনারেল শাইখা আল নুওয়াইস বলেন, “প্রতিদিন ২৩০ কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অথচ খাদ্য অপচয় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে ১০ শতাংশ অবদান রাখছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ‘রেসিপি অফ চেঞ্জ’ ঠিক সেই দৃঢ় পদক্ষেপই নিতে চায়।” তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, পর্যটনখাতের মাধ্যমে ভোক্তা আচরণকে প্রভাবিত করার বিশাল সুযোগ রয়েছে।

ইউএনইপির ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ইকোনমি বিভাগের পরিচালক শীলা আগরওয়াল-খান উল্লেখ করেন যে, পর্যটন ব্যবসাগুলো মেন্যু নতুন করে সাজিয়ে এবং স্মার্ট কৌশল প্রয়োগ করে খাদ্য বর্জ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। তিনি বলেন, “এই খাতের সক্ষমতা অসাধারণ। অতিথিদের আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা শুধু পরিবেশ রক্ষা করব না, বরং ব্যবসায়িক ব্যয়ও কমাতে পারব।”

উদ্যোগটি পূর্ববর্তী সফল প্রচেষ্টার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। হিলটন এবং উইনাও-এর যৌথ ‘গ্রিন রমজান’ অভিযান এর অন্যতম উদাহরণ। ২০২৩ সালের প্রাথমিক পর্যায়ে এই অভিযানে খাদ্য অপচয় ৬০ শতাংশেরও বেশি কমানো সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীকালে তা ৩টি হোটেল থেকে বাড়িয়ে ২০২৬ সালে ৬৪টি হোটেলে সম্প্রসারিত করা হয়েছে এবং ২০-৩০ শতাংশ হ্রাস ধরে রাখা গেছে। এই সাফল্য ‘রেসিপি অফ চেঞ্জ’-কে আরও শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে।

খাদ্য অপচয় কমানোর সুবিধা শুধু পরিবেশগত নয়। এটি ব্যবসায়িক ব্যয় হ্রাস করে, সরবরাহ চেইনের স্থিতিশীলতা বাড়ায় এবং বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন যে, অপচয় কমলে তাদের অপারেশনাল খরচ কমবে এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক মজবুত হবে। একই সঙ্গে পর্যটকদের মধ্যে টেকসইতার সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, যা ভবিষ্যতের পর্যটনকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলবে।

আয়োজকরা বিশ্বের আরও অনেক পর্যটন প্রতিষ্ঠানকে এই উদ্যোগে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, একক প্রচেষ্টায় এই বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব নয়। সম্মিলিত পদক্ষেপই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফলতা আনতে পারে। ‘রেসিপি অফ চেঞ্জ’ শুধু একটি কর্মসূচি নয়, বরং পর্যটন খাতের জন্য একটি নতুন দর্শন—যেখানে লাভের সঙ্গে পরিবেশ ও সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করা হবে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পর্যটন শিল্পের চেহারা বদলে যাবে। হোটেলগুলোতে খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে অতিথিদের অভিজ্ঞতা পর্যন্ত সবকিছুতে টেকসইতা প্রাধান্য পাবে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর পর্যটন খাতও এর থেকে উপকৃত হতে পারে যদি তারা এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। খাদ্য অপচয় কমানোর মাধ্যমে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, স্থানীয় অর্থনীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তাও শক্তিশালী হবে।

‘রেসিপি অফ চেঞ্জ’ প্রমাণ করে যে, ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে বড় বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব। আন্তর্জাতিক বর্জ্যমুক্ত দিবসে এই উদ্যোগের উদ্বোধন একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। এখন সময় এসেছে সবঅংশীদারদের একত্রিত হয়ে এই ‘রেসিপি’ বাস্তবে রূপ দেওয়ার। পর্যটনের ভবিষ্যৎ যেন সবুজ ও টেকসই হয়—এটাই এই উদ্যোগের মূল বার্তা।

Read Previous

বিমান ভাড়ায় আগুন: মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কায় যাত্রীরা দিশেহারা, এভিয়েশন খাতে সংকট গভীর

Read Next

শ্রীলঙ্কা পর্যটন উন্নয়ন ব্যুরো ঢাকায় আয়োজন করছে প্রথম মিডিয়া নেটওয়ার্কিং সেশন ও বিটুবি রোডশো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular