১৯/০৪/২০২৬
৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নদীমাতৃক বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্পের বিলুপ্তি: রিভারাইজ পর্যটন কেন গড়ে উঠছে না, উত্তরণের পথ কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ :বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এখানে ৭০০-এরও বেশি নদ-নদী ও খাল-বিল রয়েছে, যা একসময় দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও সংস্কৃতির মূল স্তম্ভ ছিল। প্রাচীনকাল থেকে ৩ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো ঐতিহ্যের কাঠের নৌকা ছিল এই নদীগুলোর প্রাণ। মালার, পান্সি, গোইনা, পাতাম, বালার, পোদি, শাম্পান, শুলুক, চাঁদ নৌকা, ডিঙ্গি ও ময়ূরপঙ্খী—এমন প্রায় ১২০ ধরনের নৌকা একসময় নদীতে ভাসত। এগুলো শুধু যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বাহন ছিল না, বরং কৃষকের ফসল বহন, মাছ ধরা, সামাজিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আজ সেই ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে। একই সঙ্গে নদীমাতৃক এই দেশে রিভারাইজ পর্যটন (নদীভিত্তিক পর্যটন) গড়ে উঠতে পারছে না। এর ফলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিতভাবে এর কারণ অনুসন্ধান করব এবং উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় তুলে ধরব।

নৌকা শিল্পের অবলুপ্তির মূল কারণ যান্ত্রিক সভ্যতার আগমন। ১৯৮০-এর দশকে আমদানিকৃত ডিজেল ইঞ্জিনের প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে ইস্পাতের তৈরি মোটরচালিত নৌযান (লঞ্চ, ট্রলার) দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এগুলো কাঠের নৌকার চেয়ে অনেক দ্রুত, কম সময়ে বেশি যাত্রী ও পণ্য বহন করতে পারে এবং রক্ষণাবেক্ষণও সহজ। ফলে পাবনার নগরবাড়ি ঘাটের মতো ব্যস্ত নৌকা নির্মাণ কেন্দ্র ১৯৯৮ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। একসময় যেখানে বড় বড় মালার নৌকা (৯৩ ফুট পর্যন্ত) তৈরি হতো, সেখানে এখন শুধু পুরনো নৌকার ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। কাঠের নৌকা তৈরি করতে সময় লাগে দু-তিন মাস, কিন্তু আধুনিক জীবনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে এটি পিছিয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয় বড় কারণ কাঠের সংকট। বন উজাড় ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের কারণে উন্নতমানের কাঠ (যেমন গজারি, শাল, সেগুন) দুর্লভ ও দামি হয়ে উঠেছে। নদী ভরাট, নাব্যতা হ্রাস ও দখলের ফলে অনেক নদী এখন অগভীর, যেখানে বড় কাঠের নৌকা চলাচল করা কঠিন। সড়ক ও রেলপথের ব্যাপক উন্নয়নও নদীপথের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। ফলে কারিগররা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। পাবনার বয়স্ক কারিগর বৈদ্যনাথ চন্দ্র শূত্রধরের মতো শতাধিক দক্ষ কারিগর এখন শুধু মডেল নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাঁদের ছেলেরা শিক্ষা নিয়ে অন্য পেশায় যাচ্ছে, কারণ নৌকা তৈরির শিল্পে আর ভবিষ্যৎ দেখছেন না। সঙ্গে সঙ্গে লোহার কামার, দড়ির তৈরিকারক ও পালের কারিগরদেরও জীবিকা হারাচ্ছে। ফ্রেন্ডশিপ এনজিও-র মতো উদ্যোগে রুনা খানের নেতৃত্বে ১৫০-এর বেশি মডেল নৌকা তৈরি হয়েছে এবং সাভারের কাছে বঙ্গবন্ধু ফ্রেন্ডশিপ বোট মিউজিয়াম গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে—কিন্তু এটি শুধু সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন নয়।

এই শিল্পের বিলুপ্তি শুধু সাংস্কৃতিক ক্ষতি নয়, অর্থনৈতিকও। হাজার হাজার কারিগর ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিক বেকারত্বের মুখে পড়েছেন। নদীভিত্তিক জীবিকা (মাছ ধরা, বাণিজ্য) ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে রিভারাইজ পর্যটনের অব্যবহৃত সম্ভাবনা আরও বড় সমস্যা। বাংলাদেশের নদীগুলোতে রয়েছে অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ, পদ্মা-মেঘনা-যমুনার বিস্তৃত জলরাশি, জলজ প্রাণী ও গ্রামীণ জীবন। আন্তর্জাতিক মানের রিভার ক্রুজ, ইকো-ট্যুরিজম, নৌকা ভ্রমণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এখান থেকে বিপুল আয় ও কর্মসংস্থান সম্ভব। গবেষণা বলছে, রিভার ট্যুরিজম স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে, বেকারত্ব কমাতে পারে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG) অর্জনে সাহায্য করতে পারে। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী ক্রুজের মতো উদ্যোগও সম্ভাবনাময়।

কিন্তু কেন এই পর্যটন গড়ে উঠছে না? প্রধান বাধা অবকাঠামোর অভাব। নদীতীরে যথাযথ জেটি, টার্মিনাল, নৌকা ডক ও নিরাপদ ঘাট নেই। নদী দখল, পলি জমে নাব্যতা কমে গেছে। নিরাপত্তা ও নিরাপত্তার সমস্যা বড়—দুর্ঘটনা, চুরি, অবৈধ দখল ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ধারণা বিদেশি পর্যটকদের ভয় দেখায়। দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে; নৌকা চালক, গাইড ও পর্যটন ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণ নেই। অর্থায়নের স্বল্পতা, পরিবেশ দূষণ (প্লাস্টিক, শিল্পবর্জ্য), প্রচারের অভাব এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের নেতিবাচক ইমেজ (বন্যা, দুর্যোগ) আরও বাধা। ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা খুব কম; ২০১৯ সালে মাত্র ৩ লাখ ২৩ হাজার বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন, যা জনসংখ্যার তুলনায় নগণ্য।

উত্তরণের উপায় আছে, কিন্তু তা দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ চায়। প্রথমত, সরকারি নীতিতে নৌকা শিল্পকে সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। কাঠের নৌকা তৈরিতে সাবসিডি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও কারিগরদের জন্য অনুদান দিয়ে ঐতিহ্য রক্ষা করা যায়। রুনা খানের মতো উদ্যোক্তাদের সহায়তায় লিভিং মিউজিয়াম ও ওয়ার্কশপ চালু করা দরকার। দ্বিতীয়ত, রিভারাইজ পর্যটনের জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) গড়ে তুলতে হবে। নদীতীরে আধুনিক জেটি, ইকো-রিসোর্ট, সোলার-চালিত ইকো-বোট ও নিরাপদ ক্রুজ তৈরি করা যায়। সুন্দরবন, বরিশাল-কুয়াকাটা রুট ও পদ্মা-মেঘনা অঞ্চলে কম খরচের নৌকা ভ্রমণ প্যাকেজ চালু করলে দেশি পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়বে।

তৃতীয়ত, পরিবেশ রক্ষা জরুরি। নদী দূষণমুক্ত করা, পলি অপসারণ ও নাব্যতা বৃদ্ধির প্রকল্প নিতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক মানের প্রচার চালাতে হবে—সোশ্যাল মিডিয়া, ট্যুর অপারেটর ও ভিসা সহজীকরণের মাধ্যমে। দক্ষ জনবল তৈরিতে ভোকেশনাল ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করা যায়। পঞ্চমত, ঐতিহ্যবাহী নৌকাকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে সাংস্কৃতিক ট্যুর (যেমন পালতোলা নৌকায় সূর্যাস্ত দেখা, গ্রামীণ উৎসব) চালু করলে দুটি সমস্যারই সমাধান হবে। ভারতের সঙ্গে যৌথ নদী ক্রুজ চুক্তি বাস্তবায়ন করলে আঞ্চলিক পর্যটন বাড়বে।

সরকার, এনজিও ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে এগোলে বাংলাদেশের নদীগুলো শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে। নৌকা শিল্প রক্ষা করলে হাজার হাজার কারিগরের জীবিকা ফিরবে, রিভারাইজ পর্যটন গড়ে উঠলে লাখ লাখ কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আসবে। এখনই সময়, যাতে নদীমাতৃক বাংলাদেশ তার ঐতিহ্য হারিয়ে না ফেলে এবং অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধ হয়। এই উত্তরণ শুধু অর্থনীতির নয়, জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতিরও।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

ব্র্যাক ব্যাংকের কার্ডধারীরা পাবেন ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টে আকর্ষণীয় ছাড়

Read Next

শেনজেন ভিসা আবেদনে জাল নথির বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা: ঢাকায় যৌথ মিশনের নতুন নির্দেশনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular