
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : গোপালগঞ্জের মধুমতি নদীর মাঝখানে ভাটার সময় জেগে ওঠা বিশাল বালুচর এখন পরিণত হয়েছে এক অভূতপূর্ব পর্যটন স্পটে। স্থানীয় ও দর্শনার্থীদের দেওয়া নাম ‘মিনি কক্সবাজার’—যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দিগন্তজোড়া সাদা বালুকাময় ভূমি, চারপাশে শান্ত নীল জলরাশি আর বিকেলের সোনালি সূর্যাস্তের মায়াবী দৃশ্য মিলিয়ে এই স্থানটি যেন নদীর বুকে এক টুকরো সমুদ্রসৈকতের অনুভূতি দিচ্ছে। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ছবি ও ভিডিওর কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ছুটে আসছেন এখানে, যা গোপালগঞ্জ ও নড়াইল অঞ্চলে নতুন উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করেছে।
এই বিস্তৃত চরটি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের চর মাটলা খেয়াঘাটের কাছে অবস্থিত, জেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। নদীর মাঝবরাবর জেগে ওঠা এই বালুচর গোপালগঞ্জ ও নড়াইল জেলার সীমান্তে পড়ে। জোয়ারের সময় পুরো চরটি পানির নিচে তলিয়ে যায়, আর ভাটায় ধীরে ধীরে উঠে আসে ধবধবে সাদা বালুর বিশাল দ্বীপ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন নদী চিরে তৈরি হয়েছে এক অনন্য প্রাকৃতিক সৈকত। যদিও এখানে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ নেই, তবু শান্ত জলের সঙ্গে বালুচরের মিলনে এক অপার্থিব সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময় পুরো এলাকা সোনালি আভায় ঝলমল করে ওঠে, যা দর্শনার্থীদের মন কেড়ে নিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ড্রোন শট, ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এই স্থানের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়েছে। গোপালগঞ্জ ও নড়াইল ছাড়াও বাগেরহাট, মাগুরা, ফরিদপুরসহ আশপাশের জেলা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক আসছেন। ছুটির দিনে ভিড় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। দর্শনার্থীরা বালুচরে হেঁটে বেড়ান, ফুটবল খেলেন, ছবি তোলেন কিংবা নদীর জলে পা ভিজিয়ে সময় কাটান। অনেক পরিবার পিকনিকের আয়োজন করে পুরো দিন উপভোগ করছেন। তরুণরা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ও খেলাধুলায় মেতে উঠছেন।
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার এক প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শ্যাম চন্দ্র রায় স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে এসে বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দেখে এসেছি। জায়গাটি সত্যিই মনোমুগ্ধকর। বাগেরহাটের চিতলমারী থেকে আসা এক দর্শনার্থী জানান, নদীর মাঝে এমন বিস্তীর্ণ বালুচর দেখে সমুদ্রসৈকতের অনুভূতি হচ্ছে।
দর্শনার্থীদের আগমনে চরের আশপাশে ছোট ছোট দোকানপাট গড়ে উঠেছে। চা, পানীয়, হালকা খাবার ও স্ন্যাকস বিক্রি করে স্থানীয়রা ভালো আয় করছেন। নদী পারাপারের জন্য ট্রলার ও নৌকার চাহিদা বেড়েছে। ট্রলারচালকরা জানান, আগের চেয়ে এখন প্রতিদিন অনেক বেশি যাত্রী পারাপার করছেন। নৌকায় করে চরে যাওয়ার ভাড়া ২০-১০০ টাকার মধ্যে, যা সবার জন্য সহজলভ্য।
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে স্বেচ্ছাসেবক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা নদীতে নামার সময় সতর্কতা, নিরাপদ চলাচল এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সচেতনতা ছড়াচ্ছেন। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কৌশিক আহম্মেদ চরটি পরিদর্শন করে বলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ আসছেন। নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের ধারণা, আসন্ন ঈদ উৎসবে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে। সঠিক পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে এই চর ভবিষ্যতে গোপালগঞ্জের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য এবং মানুষের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে ‘মিনি কক্সবাজার’ এখন গোপালগঞ্জ অঞ্চলের নতুন গর্ব। এটি শুধু একটি বালুচর নয়, বরং নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার



