২৩/০৪/২০২৬
১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিজয়নগরে কমলার বাগান এখন নতুন পর্যটন আকর্ষণ, প্রবাসফেরত আলমগীরের উদ্যোগে দর্শনার্থীদের ভিড়

কমলা বাগান

ছবি : সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলায় গড়ে ওঠা একটি কমলা বাগান এখন ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে নতুন পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে। চায়না-থ্রি জাতের কমলার বাণিজ্যিক চাষকে কেন্দ্র করে এই বাগান ইতোমধ্যে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আগত দর্শনার্থীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বিজয়নগর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের দুলালপুর এলাকায় অবস্থিত এই কমলা বাগান গড়ে তুলেছেন প্রবাসফেরত কৃষক মো. আলমগীর ভূঁঞা। দীর্ঘ ১৭ বছর বিদেশে কর্মজীবন শেষে দেশে ফিরে তিনি দুই বিঘা জমি লিজ নিয়ে শুরু করেন চায়না-থ্রি জাতের কমলার চাষ। একসময় যে জায়গাটি জঙ্গলাকীর্ণ ও অনিরাপদ বলে পরিচিত ছিল, আজ সেটিই পরিণত হয়েছে মানুষের পদচারণায় মুখর এক সবুজ দর্শনীয় স্থানে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দর্শনার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলো বিজয়নগরের এই কমলা বাগানকে পরিচিত করেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রতিদিনই পরিবার, বন্ধুদের দল, শিক্ষার্থী এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটররা আসছেন বাগানটি দেখতে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও বানাচ্ছেন, আবার কেউ প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাচ্ছেন ঝুলন্ত হলুদ কমলার সারির নিচে।

দর্শনার্থীদের আগমন নিয়মিত হওয়ায় বাগানে প্রবেশের জন্য ২০ টাকা টিকিট নির্ধারণ করা হয়েছে। উদ্যোক্তা আলমগীর ভূঁঞা জানান, শুরুতে বাগানটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। তবে অনুমতি ছাড়া ফল পেড়ে নেওয়া এবং গাছের ক্ষতি হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দর্শনার্থীরা অবাধে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারলেও গাছ থেকে নিজ হাতে কমলা পাড়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এই কমলা বাগান ঘিরে স্থানীয় পর্যটন অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাগানের আশপাশে গড়ে উঠেছে চায়ের দোকান, ফুচকা, ঝালমুড়ি, পিঠা ও ভাজাপোড়ার অস্থায়ী স্টল। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন এসব দোকানে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মতো বেচাকেনা হচ্ছে। এতে এলাকার অনেক মানুষের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন আয়ের সুযোগ।

বিজয়নগর উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই ‘ফলের রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত। এখানে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, লটকন, পেয়ারা ও মালটার মতো নানা মৌসুমি ফলের চাষ হয়ে আসছে। সেই তালিকায় নতুন সংযোজন হিসেবে যুক্ত হয়েছে চায়না-থ্রি জাতের কমলা। কৃষি ও পর্যটনের এই সম্মিলিত উদ্যোগ এলাকাটির পরিচিতিকে আরও বিস্তৃত করছে।

আলমগীর ভূঁঞা জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে ইউটিউবসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে তিনি এই জাতের কমলার চাষ শুরু করেন। রোপণের দুই বছরের মধ্যেই গাছে ফল আসতে শুরু করে। বর্তমানে তার বাগানে প্রায় ১৮০টি গাছে ছোট আকারের, হলুদ রঙের সুদৃশ্য কমলা ঝুলছে। মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কিছু ফল ঝরে পড়লেও চলতি বছরে তিনি প্রায় দুই মেট্রিক টন কমলা উৎপাদনের আশা করছেন।

বাজারে এই কমলার চাহিদাও ভালো। শুরুতে কেজিপ্রতি ২২০ টাকা দরে বিক্রি হলেও দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে এখন দাম কমিয়ে ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাগানে আসা অনেক দর্শনার্থী সরাসরি কৃষকের কাছ থেকেই কমলা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

বিজয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মতে, এই অঞ্চলে চায়না জাতের কমলার চাষ সম্ভাবনাময়। দুলালপুরের পাশাপাশি আশপাশের এলাকাতেও কয়েকজন কৃষক এই ফলের চাষ শুরু করেছেন। ভবিষ্যতে পরিকল্পিতভাবে বাগানভিত্তিক পর্যটন গড়ে তুলতে পারলে বিজয়নগর একটি নতুন কৃষি-পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

স্থানীয়দের বিশ্বাস, প্রবাসফেরত আলমগীর ভূঁঞার এই উদ্যোগ শুধু কৃষিতে নয়, পর্যটন ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। প্রকৃতি, ফলের বাগান ও গ্রামীণ পরিবেশ—সব মিলিয়ে বিজয়নগরের এই কমলা বাগান এখন পর্যটকদের জন্য এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার নাম।

প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার

Read Previous

ঘন কুয়াশায় স্থবির রাজধানীর আকাশপথ, ঢাকাগামী আটটি বিমান ডাইভার্ট

Read Next

হাকালুকি হাওরে বাড়ছে শীতের অতিথি পাখি, ভিড় জমাচ্ছেন পর্যটকরা: সৌন্দর্যের আড়ালে বাড়ছে অবৈধ শিকার, উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular